ইরানকে বদলে দিতে গিয়ে ভয়ংকর শিক্ষা পেয়েছে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরাইল। প্রথমে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করে নিজের মতো করে একটি পুতুল শাসনযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এ জন্য তিনি প্রকাশ্যে দেশটির সার্বভৌমত্বকে লঙ্ঘন ও ইরানিদের সরকার পতনের আন্দোলনে উস্কানি দিয়েছিলেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, ইরানে হামলা চালানোর পর ট্রাম্প ইরাক বা জর্ডান সীমান্তে অবস্থানরত বিদ্রোহী কুর্দিদের অস্ত্র সহযোগিতা দিচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ইরানে অশান্তি সৃষ্টি করে সেখানকার শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়া। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ইরান থেকে উৎখাত রেজা শাহ পাহলভির ছেলে রেজা শাহ। তিনিও ইরানিদের কম উস্কানি দেননি। তিনি ভেবেছিলেন সুযোগ এসে গেছে। এবার তিনি পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বদলা নেবেন। কিন্তু তাদের তরফের কেউই সফল হয়নি। না যুক্তরাষ্ট্র, না ইসরাইল, না রেজা শাহ কেউই ইরানের শাসনযন্ত্রের একটি চুলও নড়াতে পারেননি। যা পেরেছেন তা হলো ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করেছেন। কিন্তু ইরান যে নেতৃত্বের চেইন তৈরি করে রেখেছে, তা ঠাহর করার মতো বুদ্ধিমত্তা তাদের হয়নি। ফলে ইরান যুদ্ধে প্রথম উদ্দেশ্যেই পরাজিত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। আর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা নাইবা বললাম। এখন শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সঙ্গে তার যে দস্তি ছিল, তা ঘোর বিরোধিতায় রূপ নিয়েছে। ইরানে যে নতুন শাসক আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প, তাতে তার মনোনীত ব্যক্তিকে নেতা বানাতে হবে বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু ইরানের টিকে থাকা সেই শাসকদের সঙ্গেই তাকে মাথা নত করে আলোচনায় বসতে হয়েছে। তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতে হয়েছে। ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির প্রাথমিক যে অনলাইন মারফত চুক্তি হয়েছে তাতে গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি দফা রয়েছে। এর কোনোটিই ট্রাম্প ঘোষিত নীতি
বা যুদ্ধের আগে পরে দেয়া হুমকির পক্ষে যায় না। বরং যদি গভীরভাবে যাচাই করা হয়, তাহলে দেখা যাবে তিনি এবং নেতানিয়াহু চরমভাবে হেরে গেছেন। শান্তিচুক্তির মূল বিষয়গুলো হলো-
১. যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তি ঘোষণা: দুই পক্ষ এবং তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে (লেবাননসহ) অবিলম্বে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান বন্ধ করবে এবং ভবিষ্যতে আর হামলা করবে না।
২. একে অপরের সার্বভৌমত্ব স্বীকার: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেবে।
৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি: সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি করার চেষ্টা করা হবে।
৪. নৌ অবরোধ ও সামরিক চাপ কমানো: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ধীরে ধীরে তুলে নেবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ শেষ করবে।
৫. হরমুজ প্রণালি ও সমুদ্রপথ খোলা: ইরান ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সহজ করবে এবং আঞ্চলিক সমন্বয় করবে।
৬. অর্থনৈতিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা: ইরানের জন্য ৩০,০০০ কোটি ডলারের উন্নয়ন ও পুনর্গঠন প্যাকেজের কথা বলা হয়েছে।
৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘসহ সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেয়ার কথা আছে।
৮. পারমাণবিক ইস্যু: ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি দেবে এবং ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে থাকবে।
৯. সাময়িক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা: চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বড় সামরিক পদক্ষেপ হবে না।
১০-১১. তেল ও জব্দ করা সম্পদ: ইরানের তেল রপ্তানি চালু করা এবং আটকে থাকা অর্থ ছাড় করার ব্যবস্থা থাকবে।
১২-১৪. নজরদারি ও আইনি কাঠামো: চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ব্যবস্থা থাকবে এবং চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদন পাবে।
প্রিয় পাঠক, এই ১৪টি দফার মধ্যে বলুন তো কোন দফাটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আছে? নেই। কারণ, এর প্রতিটি দফায় যেসব দাবি করা হয়েছে- তা ইরানের দাবি। ইরানের পক্ষের কথা। প্রথমত: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অন্যের সার্বভৌমত্ব মেনে চলবে। একে অন্যের বিরুদ্ধে হামলা চালাবে না। একে অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। যদি তা-ই না করে তাহলে ইরানের শাসকদের পরিবর্তন করে দেয়ার যে ঘোষণা ট্রাম্প দিয়েছিলেন- তার কি হবে? তাহলে ইরানই তো এক্ষেত্রে জয়ী। ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ৩০,০০০ কোটি ডলারের তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘসহ অন্যরা ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। উপরন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তদারক করবে আইএইএ। এতে তো ইরানের সমস্যা থাকার কথা না। কারণ, তাদের দাবি ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি চালাচ্ছে বেসামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য। সুতরাং তারা সৎ থাকলে এই তদারকি বা পর্যবেক্ষণে তাদের কোনো ভীতি নেই। ইরান কখনো বলেনি যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, বরং পশ্চিমারা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল এমন অপবাদ তাদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। ইরানের তেল রপ্তানি চালু করার কথা বলা হয়েছে। তাদের যে অর্থ জব্দ করা অবস্থায় আছে, তা ছাড় দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রিয় পাঠক, একবার সুস্থ মাথায় ভাবুন এর মধ্যে কোন দফাটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গেছে! আপনিই বিচার করতে পারবেন। দেখবেন, এর মধ্যে যেসব কথা বলা হয়েছে তার প্রতিটি ইরানের কথা। তাহলে মাথা নত করলো কে! নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন! যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। তাতে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবটাতে এবং সিনেটের অর্ধেক আসনে নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যেভাবে নিম্নমুখী, তাতে তার দল রিপাবলিকানদের ভরাডুবি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা আছে। এসব বিশ্লেষণ মার্কিন বাঘা বাঘা সাংবাদিকের। ট্রাম্প সেটা বুঝতে পেরেছেন। তিনি ইরানে স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি এডভেঞ্চার ঘটিয়ে দিয়ে বাহবা নেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু তা গুঁড়েবালি। তা উল্টো তার ক্ষমতাকে উইপোকার মতো ভেতর থেকে খেয়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় তিনি ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থায় পড়েছেন। তাই সর্বশেষ কাতারে তাদের সামরিক ঘাঁটিতে ইরান পাল্টা হামলা চালালেও যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশোধ নেয়নি। কারণ, ভিমরুলের চাকে ঢিল মারলে পরিণতি কি তা বুদ্ধিমানরা জানেন।
চুক্তি করতে গিয়ে নিজেদের প্রক্সি যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ তথা লেবাননকে ভুলে যায়নি ইরান। তারা চুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে লেবাননে ইসরাইলের নৃশংস হামলাকে। শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে লেবানন সহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হতে হবে। এতে ভীষণ নাখোশ ট্রাম্পের জানি দোস্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আসলে এই যুদ্ধে ট্রাম্পকে টেনে এনেছে নেতানিয়াহু। লেবাননকে চুক্তির আওতায় আনায় তিনি ভীষণ মনঃক্ষুণ্ন। তার জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, যদি তিনি পাশে না থাকতেন তাহলে দুই মিনিটে শেষ হয়ে যেতো ইসরাইল। এসব কথা নেতানিয়াহু, তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ মানুন বা না মানুন- কথা কিন্তু সত্য। ইরান সে প্রমাণ দিয়েছে। তাদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র যখন বৃষ্টির মতো পড়তে থাকে তেলআবিবসহ সারা দেশে তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম অসহায় হয়ে পড়েছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মধ্যে একা ইরান যুদ্ধ করেছে। তারা নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে প্রবল শক্তিধর এই দুই দেশকে। যদি এক্ষেত্রে একা ইসরাইল হতো, তাহলে তাদেরকে ধুলির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারতো ইরান।
ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে নিয়ন্ত্রণ করে এর দখল নেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। খার্গ দ্বীপ দখল করার হুমকি দিয়েছিলেন। এমনকি ইরানকেও নিয়ন্ত্রণ করার হুমকি দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার কোনো হুমকি কাজে এসেছে! কোনোটিই নয়। তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে অপহরণ করে সেখানকার তেল সম্পদ দখল করেছেন, ইরানের ক্ষেত্রেও সেটা করার স্বপ্ন দেখেছেন। ভেনেজুয়েলায় প্রশাসনের ভেতর থেকে বিশ্বাসঘাতকতা করে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করা হয়েছে। এ জন্য মাদুরোকাণ্ড ঘটাতে পেরেছেন ট্রাম্প। কিন্তু বাঘের লেজ আর শিয়ালের লেজ এক নয়। শিয়ালের লেজে পাড়া লাগলে উল্টো খ্যাক করে কামড় বসাতে পারে বা দৌড় দিতে পারে। কিন্তু বাঘের লেজে পা রাখলে পরিণতি বুঝতেই পারছেন। ইরানে সেটাই ঘটেছে। ট্রাম্প হাত-পা গুটিয়ে ফিরতে বাধ্য হয়েছে।
ট্রাম্প এক/দুইভাবে পরাজিত হননি। এবার বিশ্বকাপে ইরান দলকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের অনুমতি দেয়া হয়নি। টিম ইরান মেক্সিকোতে অনুশীলন করছে। তারা ম্যাচ ডে’তে সেখান থেকে উড়ে এসে খেলা শেষ করছে। আবার সঙ্গে সঙ্গে ফিরতি ফ্লাইটে চলে যাচ্ছে মেক্সিকো। মানবিকতার কতোটা নিষ্পেষণ হলে এমনটা ঘটতে পারে! বিশ্ব এ ঘটনাকে সহজভাবে নিতে পারেনি। কঠিন মানসিকতার পরিচয় দিয়ে ইরানি টিম বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে। তাদের জার্সিতে ১৬৮ সংখ্যাটি খোদাই করা আছে। এটা যুদ্ধের প্রথম দিন মিনাবে একটি প্রাথমিক স্কুলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বোমা হামলায় নিহত শিশুদের সংখ্যা। এ বিষয়গুলো দেখছে বিশ্ববাসী। আর এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। সর্বোপরি এক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ করছে, তাদেরকেই নিজ দেশে স্বাগত জানাতে বাধ্য হয়েছে।
এসবের মধ্যদিয়ে বিশ্বে মাত্র একটি দেশ ইরান প্রমাণ করেছে তারা কোনো পরাশক্তিকে ভয় পায় না। তারা বিশ্বের এক নম্বর শক্তিধর ব্যক্তির চোখে চোখ রেখে কথা বলতে জানে এবং শেষ বিচারে তাদেরই জয় হয়। তারা পুরো বিশ্বকে তছনছ করে দিতে পারে। কারণ, তাদের আছে হরমুজ প্রণালি। এটা বন্ধ থাকায় বিশ্ব জুড়ে হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে পুরো বিশ্ব অস্থির হয়ে পড়তো, পড়তো কী পড়েছিল তো। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বহু দেশে তেলের পাম্পগুলোতে রেশনিং করে তেল দেয়া হয়েছে। তা নিয়ে মারামারি। তেল নিতে গিয়ে প্রায় একদিন সিরিয়ালে বসে থাকতে হয়েছে। ফলে বার বার যুদ্ধের শিকার ইরান এবার অনেক কিছু প্রমাণ করেছে- তারা একটি একক দেশই বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কোনো ভয় নেই। বরং তারা অন্যদের ভয়ের কারণ হতে পারে। ্ত