১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটকে জ্বলন্ত আগুনে থাকা ফুটন্ত কড়াই বলাই শ্রেয়। নয়তো রাজনৈতিক স্থিরতায় অনুকরণীয় বৃটেন কেনইবা গত এক দশকে ছয় প্রধানমন্ত্রীকে বদলে ফেলে সপ্তম জনকে স্বাগত জানাতে চাইবে? শুরুটা হয়েছিল ডেভিড ক্যামেরনের প্রস্থানের মাধ্যমে। এরপর একে একে আসা ছয় জনের কেউই পূর্ণ মেয়াদে টিকতে পারেননি। সর্বশেষ বিদায় নিতে হয়েছে স্যার কিয়ের স্টারমারকে। তার বিদায়ের দিন ২২শে জুন ২০২৬, সোমবার সকালটি বৃটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের প্রতীক হয়ে থাকবে। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের চত্বরে যখন গ্রীষ্মের চড়া রোদ এসে পড়েছে, তখন নিজের স্ত্রী ও কর্মীদের পরিবেষ্টিত হয়ে বিদায়ী বক্তব্য দিতে দাঁড়ান প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি স্বীকার করে নেন, বৃটেনকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তিনি আর সঠিক ব্যক্তি নন। মাত্র দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, বৃটিশ রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন এই সাবেক আইনজীবী। কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরের জরাজীর্ণ শাসনের পর তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্থিতিশীলতা ও টেকনোক্রেটিক দক্ষতার। অথচ, দুই বছর পার হতে না হতেই তাকে ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতার বাইরে ছিটকে পড়তে হলো। তার এই বিদায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর রাজনৈতিক ব্যাধির লক্ষণ। বৃটেনে বিগত দুই শতাব্দীতে এত দ্রুত রাষ্ট্রনেতা পরিবর্তনের নজির নেই। এক দশক আগে যেখানে বৃটিশরা ইতালির ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন নিয়ে উপহাস করতো, আজ তারা রোমের দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাচ্ছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি চার বছর ধরে ক্ষমতায় টিকে থেকে ইতালির ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি সরকার পরিচালনার রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন। বৃটেনের এই সামগ্রিক পতনের মূলে রয়েছে দু’টি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত অভিঘাত। প্রথমত ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের একটানা স্থবিরতা। দ্বিতীয়ত ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট, যা দেশটির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চিরন্তন সমীকরণগুলোকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এই দুই ধাক্কার সম্মিলিত চাপে বৃটেনের শাসনব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যার সর্বশেষ শিকার কিয়ের স্টারমার।
সান্ডারল্যান্ডের ক্ষোভ, ব্রেক্সিটের এক দশক
বৃটেনের এই এক দশকের গোলযোগের প্রকৃত সূচনা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১০ বছর আগে, ২৪শে জুন ২০১৬ তারিখের মধ্যরাতে। সেই সময় উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডের শিল্পনগরী ও বন্দর সান্ডারল্যান্ড প্রথম শহর হিসেবে ঘোষণা করে যে, তারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। শহরের ৬০ ভাগের বেশি বাসিন্দা ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। অথচ, এই সান্ডারল্যান্ডের অর্থনীতি সরাসরি নির্ভরশীল ছিল জাপানি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিশানের কারখানার ওপর। নিশান ব্রেক্সিটের আগেই সতর্ক করেছিল যে, ইউরোপের একক বাজার থেকে বৃটেন বের হয়ে গেলে তারা কারখানাটি বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা সেই সাবধানবাণী শোনেননি। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের গৌরবময় অতীত হারিয়ে ফেলা এই শ্রমিক-অধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্রেক্সিট ছিল লন্ডন ও ব্রাসেলসের বৈশ্বিক অভিজাত সমাজকে একটি উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার মোক্ষম অস্ত্র। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চেয়েছিলেন, এমনকি তার মূল্য যদি অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয় তবুও। এ যেন নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ। আজ ব্রেক্সিট ভোটের এক দশক পর, অর্থনীতিবিদরা যখন এর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষতে বসেছেন, তখন সান্ডারল্যান্ডের সেই ক্ষোভের ফলে চুকাতে হওয়া অর্থনৈতিক মূল্যটি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক মডেল অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের কারণে বৃটেনের মাথাপিছু জিডিপি সম্ভাব্য মাত্রার চেয়ে ২.৫ থেকে শুরু করে ৮ ভাগ পর্যন্ত কম। জি-সেভেন ভুক্ত অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যেখানে মহামারি ও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গতি পেয়েছে, সেখানে বৃটেনের অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। সান্ডারল্যান্ডের নিশান কারখানাটি হয়তো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি; তবে তাদের গাড়ির উৎপাদন ২০১৬ সালের তুলনায় এখন প্রায় ৪৬ ভাগ কম। ব্রেক্সিট বৃটিশ ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। ব্রেক্সিটপন্থিরা যেভাবে বৃটেনকে ইউরোপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে উইয়ার নদীর তীরে এক ‘নব্য সিঙ্গাপুর’ বানানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, বাস্তবতার মাটিতে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। দৈনন্দিন ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্রেক্সিট নিয়ে এসেছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবিন্যস্ত জাল।
‘বরিসওয়েভ’ ব্যাকফায়ার অব ‘টেক ব্যাক কন্ট্রোল’
ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্লোগান ছিল ‘টেক ব্যাক কন্ট্রোল’ বা নিজেদের সীমানার ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া। বিশেষ করে, পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা সস্তা শ্রমের অবাধ প্রবেশাধিকার বন্ধ করাই ছিল সান্ডারল্যান্ডের মতো অঞ্চলের ভোটারদের মূল দাবি। কিন্তু ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর জনমিতি ও অভিবাসনের ক্ষেত্রে যা ঘটলো, তা ২০১৬ সালের কোনো ভোটার বা রাজনীতিবিদ কল্পনাও করেননি। ২০২০-২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কর্মীদের অবাধ প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বৃটেনের স্বাস্থ্য খাত, সামাজিক সেবা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তীব্র কর্মী ও তহবিলের সংকট মেটাতে অ-ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য কাজের ভিসা ও ইমিগ্রেশন নীতি নাটকীয়ভাবে শিথিল করেন। এর ফলে বৃটেনে শুরু হয় অভিবাসনের এক নতুন জোয়ার, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘বরিসওয়েভ’ নামে অভিহিত করেছেন। ২০২৩ সালে বৃটেনে নেট অভিবাসন ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায়। প্রায় ১০ লাখ মানুষ সে বছর বৃটেনে স্থায়ী বা সাময়িকভাবে আসেন। এর মধ্যে ৪ লাখ ৬০ হাজারের বেশি ছিলেন বিদেশি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা, যাদের চড়া টিউশন ফি বৃটেনের ভঙ্গুর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়নকে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে। বাকিদের একটি বড় অংশ এসেছিলেন জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) ও কেয়ার হোমগুলোর শূন্যপদ পূরণ করতে। যে সান্ডারল্যান্ড শহর অভিবাসন বন্ধের পক্ষে সবচেয়ে বেশি ভোট দিয়েছিল, তারাই এই ‘বরিসওয়েভ’-এর কেন্দ্রে পরিণত হয়। ২০১৯ সালে এই শহরের মোট চাকরিজীবীদের মধ্যে অ-ইইউ কর্মীদের হার ছিল মাত্র ৩ ভাগ। ২০২৪ সালের মধ্যে তা লাফিয়ে ১০ ভাগে পৌঁছায়। সান্ডারল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে এখন প্রতি ১০ জন বৃটিশ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৪ জন নেপালি, ২ জন উজবেক এবং অন্তত ১ জন ভারতীয় শিক্ষার্থী দেখা যায়। এই আকস্মিক ও দ্রুত সাংস্কৃতিক পরিবর্তন স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করে। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের মে মাসে। সে সময় দেশ জুড়ে অভিবাসনবিরোধী তীব্র দাঙ্গা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এই সামাজিক ক্ষোভকে রাজনৈতিক পুঁজি করে ২০২৬ সালের মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে ডানপন্থি পপুলিস্ট দল ‘রিফর্ম ইউকে’ বড় জয় পায়। গণভোটের ১০ বছর পর আজ বৃটেনের জনমত ব্রেক্সিট নিয়ে গভীরভাবে অনুতপ্ত। ইউগভ-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ৫৭ ভাগ বৃটিশ নাগরিক মনে করেন ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ ভুল ছিল। ‘মোর ইন কমন’ নামক সংস্থার আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, ৪৩ ভাগ মানুষ সরাসরি বিশ্বাস করেন ব্রেক্সিট তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আগের চেয়ে আরও বেশি কঠিন ও খারাপ করেছে। বিপরীতে মাত্র ১১ ভাগ মানুষ মনে করেন তাদের জীবন ভালো হয়েছে। এই অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য বৃটিশরা যে আবার ইইউতে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন করবে, তারও কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। কারণ বৃটিশদের একটি বড় অংশই মনে করে, তাত্ত্বিকভাবে ইইউতে ফিরে যাওয়া ভালো হলেও, ব্যবহারিক ও রাজনৈতিকভাবে অদূর ভবিষ্যতে তা আর কখনোই সম্ভব নয়। বৃটেন এখন ব্রেক্সিটের এক চক্রব্যূহে আটকে গেছে।
ক্যামেরন থেকে স্টারমার: বিগত এক দশকের ৬ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ও তাদের পতনের চালচিত্র
মহামারির মতো ক্ষমতা ত্যাগের সূচনা হয়েছিল ২০১৬ সালে। ব্রেক্সিট গণভোটে নিজের ‘রিমেইন’ শিবিরের পরাজয়ের পরদিনই পদত্যাগ করেন ডেভিড ক্যামেরন। তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে তেরেসা মে সুশৃঙ্খলভাবে ব্রেক্সিট চুক্তি পাসের আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু নিজের কনজারভেটিভ পার্টির কট্টরপন্থিদের তীব্র বিদ্রোহ ও পার্লামেন্টে তিনবার চুক্তিটি পাস করাতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৯ সালে তিনি বিদায় নেন। এরপর ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার স্লোগান দিয়ে বিশাল জয় নিয়ে আসেন বরিস জনসন। ব্রেক্সিট কার্যকর করলেও করোনা লকডাউনের নিয়ম ভেঙে ডাউনিং স্ট্রিটে বেআইনি মদের আসর বসানোর ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারির জেরে দলের ভেতরেই সমর্থন হারিয়ে ২০২২ সালে অপসারিত হন তিনি। তারপর মাত্র ৪৫ দিনের জন্য ক্ষমতায় ছিলেন লিজ ট্রাস। কোনো তহবিল ছাড়াই ধনীদের কর কমানোর একটি চরম উগ্র অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পেশ করায় বৃটিশ বন্ড মার্কেট ও পাউন্ডের মানে নজিরবিহীন ধস নামে। যার ফলে দেশের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে পদচ্যুত হতে হয়। এই অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয় সামাল দিতে প্রথম বৃটিশ-এশিয়ান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ঋষি সুনাক। তিনি বাজার শান্ত করতে পারলেও জীবনযাত্রার স্থবির মান, স্বাস্থ্যসেবার অবনতি ও অভিবাসন সংকটে ক্ষুব্ধ জনগণ ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টিকে ধূলিসাৎ করে দেয়। সবশেষে, কনজারভেটিভ আমলের বিশৃঙ্খলা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন লেবার পার্টির কিয়ের স্টারমার। কিয়ের স্টারমারের পতনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল মূলত গত মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয়কর ফলাফলের পর। প্রায় ১,৫০০ কাউন্সিলর পদ হারানোয় দলের প্রায় ১০০ জন এমপি তার নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা দিলে কিয়ের স্টারমার বুঝতে পারেন যে, পার্লামেন্টারি লেবার পার্টি এখন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন অবস্থানে রয়েছে। নিজের চিফ অব স্টাফের পদত্যাগ এবং বৃটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিতর্কিত যৌন পাচারকারী জেফ্রি এপেস্টাইনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ফলে তার ব্যক্তিগত সততা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অবশেষে আর কোনো পথ না পেয়ে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।
ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং এক খণ্ডিত সাম্রাজ্য
কিয়ের স্টারমার যখন ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বিদায় নিচ্ছেন, তখন বৃটেনের সামনে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটই নেই, বরং এক বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক ঝড়ের পূর্বাভাস রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান বিভিন্ন সংকট-ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন, গাজা ও ইরানের উত্তেজনা এবং গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বৃটেনের পররাষ্ট্রনীতিকে এক চরম পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। দেশের ভেতরের খণ্ডিত রাজনীতি লন্ডনের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এখানেই বৃটেনের সবচেয়ে বড় উভয় সংকট। একদিকে বিশ্বরাজনীতি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার উপস্থিতি গুটিয়ে নেয়ায় এবং ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক অস্থির হয়ে ওঠায়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং ইউরোপের নিরাপত্তায় লন্ডনের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা বহুগুণ (এক্সপোনেনশিয়ালি) বেড়ে গেছে। অপরদিকে বৃটেনের ভেতরের রাজনৈতিক দলগুলোর মেরূকরণ ও ভাঙন এখন চরম পর্যায়ে। ২০২৬ সালের মে মাসের নির্বাচনে কেবল ডানপন্থি ‘রিফর্ম ইউকে’ বা বামপন্থি ‘গ্রিন পার্টি’রই উত্থান ঘটেনি। বরং স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো এবং গাজা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ডের মুসলিম স্বাধীন প্রার্থীদের জয়লাভ বৃটেনের মূলধারার রাজনীতিতে এক নতুন ধরনের উপদলীয় বা সেকটারিয়ান মেরূকরণ তৈরি হয়েছে। যা একসময় কেবল উত্তর আয়ারল্যান্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রিন পার্টির পপুলিস্ট নেত্রী, যিনি একসময় হাইপনোথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করতেন, তিনি চরম বামপন্থি ও পরিবেশবাদীদের এক সুসংহত জোট তৈরি করে লেবার পার্টির ভোটব্যাংকে বড় ফাটল ধরিয়েছেন। অন্যদিকে ফারাজের রিফর্ম পার্টি কনজারভেটিভদের সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে ২০২৯ সালের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখচ্ছে। বৃটেনের ভোটাররা এখন আর কেবল দু’টি বড় দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তারা পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
বেক্সিট পরবর্তী উপাখ্যান
ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পর এবং কিয়ের স্টারমার-এর পদত্যাগের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বৃটেনের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটি এখন তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন শাসনতান্ত্রিক সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। স্যাম ফ্রিম্যান তার সামপ্রতিক প্রকাশিত ‘ফেইল্ড স্টেট: হোয়াই নাথিং ওয়ার্কস অ্যান্ড হাউ উই ফিক্স ইট’ গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, বৃটেনের শাসনব্যবস্থা অতিরিক্ত মাত্রায় লন্ডন-কেন্দ্রিক এবং এর প্রধান সরকারি দপ্তরগুলো বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের বিশাল চাপ সামলানোর জন্য অত্যন্ত ছোট ও অপ্রস্তুত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, যা রাজনীতিবিদদের সুদূরপ্রসারী কোনো নীতি প্রণয়নের পরিবর্তে প্রতিদিনের সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে দৌড়াতে এবং তড়িঘড়ি করে কাঁচা আইন তৈরি করতে বাধ্য করছে। ব্রেক্সিট কোনো জাদুমন্ত্র ছিল না যা এক নিমেষে বৃটেনের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে, আবার ব্রেক্সিট কোনো একক অভিশাপও নয় যার কারণে বৃটেনের এই সামগ্রিক পতন ঘটেছে। ব্রেক্সিট ছিল আসলে বৃটেনের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসমতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের একটি মরিয়া চিৎকার। কিন্তু বিগত এক বা এক দশকে বৃটেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই ক্ষোভের মূল কারণগুলো-যেমন উৎপাদনশীলতার অভাব, আবাসন সংকট, আঞ্চলিক বৈষম্য ও ভঙ্গুর সরকারি সেবা-সমাধান করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তারা কেবল ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের দরজা দিয়ে একে একে ভেতরে ঢুকেছেন আর বের হয়ে গেছেন, দেশ পরিচালনার কোনো সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তারা দিতে পারেননি।
শেষ টেক্কা বার্নহ্যাম
স্থানীয় নির্বাচনে হারার পর লেবার পার্টি চূড়ান্ত অনাস্থা জানায় স্টারমারের প্রতি। তবুও দৃঢ়তার সঙ্গে সব প্রতিকূলতা মোকাবিলার ঘোষণা দেন কিয়ের স্টারমার। এতে তাকে অপসারণে ফন্দি আঁটেন লেবার দলের আইনপ্রণেতারা। মেকারফিল্ড আসনের এমপি পদত্যাগ করেন। সেখানে উপ-নির্বাচনে জিতিয়ে লেবার দলের তুরুপের তাস অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী এই লেবার মেয়র ১৮ই জুন ২০২৬ তারিখের ৫৫ ভাগ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জেতেন। তিনি মেয়র পদ ছেড়েছেন নিশ্চয় আরও বড় দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলেই। বার্নহ্যামের এই প্রত্যাবর্তন লেবার পার্টির ভেতরের স্টারমার-বিরোধী অংশকে একটি শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্ব এনে দেয়। যার ফলে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন বৃটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বা ‘প্রধানমন্ত্রী-ইন-ওয়েটিং’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যদিও বার্নহ্যামের পথ কণ্টকমুক্ত হবে না। স্টারমার যখন বিদায় নিচ্ছেন, বার্নহ্যামের জন্য রেখে যাচ্ছেন এমন এক বৃটেন, যা দুই বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি খণ্ডিত, মেরুকৃত এবং শাসন করা কঠিন। অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যদি দ্রুত একটি যোগ্য মন্ত্রিসভা গঠন করে দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও অভিবাসন নীতি নিয়ে একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য পথচিত্র বা ‘ভিশন’ তৈরি করতে না পারেন, তবে ঋষি সুনাকের সেই আশঙ্কাবাণীই সত্যি হবে-বার্নহ্যামও হবেন ডাউনিং স্ট্রিটের বিছানায় মাঝরাতে জেগে থাকা আরেকজন ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী, যিনি কেবলই ভেবে আকুল হবেন যে- কেন কোনো কিছুই কাজ করছে না। বার্নহ্যাম কতোটা সফল হবেন তা সময়ই বলে দিবে। তবে বৃটেনের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক নাটক ও মোহভঙ্গের উপাখ্যান আজ ১০ বছর পরও এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকেই ইঙ্গিত করছে। ্ত