বিশ্বকাপে রাজনীতি বিতর্ক

ডমিনিক মাস্ট্রাঞ্জেলো | আন্তর্জাতিক
জুন ২৭, ২০২৬
বিশ্বকাপে  রাজনীতি  বিতর্ক

বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে ভূ-রাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি এবং নাটকীয় গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচের কারণে টুর্নামেন্টটি বিশ্ব জুড়ে দর্শকদের জন্য আরও উত্তেজনাপূর্ণ নকআউট রাউন্ডের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া আয়োজন, যা ২০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো উত্তর আমেরিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন দর্শক তৈরি করছে এবং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে বৈশ্বিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সামনে আনছে। এখানে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ থেকে এ পর্যন্ত ৫টি বড় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হলো।
 

১. বিশ্বকাপে রাজনীতি আবারো সামনে এসেছে
রাজনীতি বহু দশক ধরে বিশ্বকাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে ২০২৬ টুর্নামেন্টে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেশি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। টুর্নামেন্টের প্রথম সপ্তাহটি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ইরান একটি দল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে খেলছে। ইরানের খেলোয়াড় ও কোচরা বিশেষ নজরদারিতে পড়েছেন। বিশেষ করে প্রথম ম্যাচের পর তাদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হয়েছে এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাননি। ফলে ইরান দল বর্তমানে মেক্সিকোতে অনুশীলন করছে। ইরান দলের কর্মকর্তারা বলেছেন, অতিরিক্ত ভ্রমণ মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান দলের ম্যাচের বাইরে তাদের সরকারবিরোধী ও যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভও দেখা গেছে। কিছু সমর্থক বলেছেন, চলমান সংঘাতের কারণে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের মাধ্যমে ইস্যু করা টিকিট ফিফা স্বীকৃতি দেবে না। একজন ফিফা কর্মকর্তা দ্য হিল’কে বলেছেন, তারা ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে যাতে ইরানি সমর্থকদের জন্য সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি বিশ্বকাপে বড় প্রভাব ফেলছে। কিছু ম্যাচে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালাচ্ছে এবং ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) একজন সোমালি রেফারিকে নিরাপত্তার কারণে দেশে প্রবেশে বাধা দিয়েছে। কিছু ডেমোক্রেট ও অভিবাসন অধিকারকর্মী আইস (আইসিই) ও ডিএইচএস কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, বৈধভাবে থাকা দর্শকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিদেশি খেলোয়াড়দের পরিবার ভিসা পেতে সমস্যায় পড়ছেন, আর টিকিটের উচ্চ দাম অনেক সমর্থককে স্টেডিয়াম থেকে দূরে রেখেছে।
 

২. যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞাপন বাজার বিশ্ব ফুটবলকে বদলে দিচ্ছে
এই বছরের বিশ্বকাপ ফিফা’র ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে। নাইকি, অ্যানহেউজার-বুশ এবং অ্যাডিডাস-এর মতো বড় ব্র্যান্ডগুলো শীর্ষ ম্যাচগুলোর জন্য বিশাল বিজ্ঞাপন বাজেট দিয়েছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিককে কেন্দ্র করে। ফক্স এই টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যেই বড় রেটিং পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ম্যাচ বনাম প্যারাগুয়ে’তে প্রায় ২৭ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক দেখা গেছে। অনেক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এনএফএল স্টেডিয়ামে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া অর্থনীতির কেন্দ্র। ফিফা নিয়ম অনুযায়ী স্পন্সরহীন কর্পোরেট নাম ব্যবহার নিষিদ্ধ, যা দেখিয়ে দেয় যে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যিক ক্রীড়া পরিবেশ কতটা প্রতিযোগিতামূলক। স্পোর্টস বিজনেস জার্নাল-এর গবেষণা অনুযায়ী, স্টেডিয়াম নামাধিকার থাকা ব্র?্যান্ডগুলো প্রায় ৫৩.৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রচারমূল্য হারাতে পারে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি করবে এবং হাজার হাজার চাকরি সৃষ্টি করবে।
 

৩. হাইড্রেশন বিরতি বিতর্ক তৈরি করেছে
এই বিশ্বকাপে নতুন যুক্ত হয়েছে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’- প্রতি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে খেলোয়াড়দের পানি পানের জন্য বিরতি। ফিফা বলেছে, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য এটি প্রয়োজনীয়। প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হওয়ায় এই বিরতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এতে ম্যাচের গতি নষ্ট হয় এবং কিছু দল কৌশলগত সুবিধা নিতে পারে। নেদারল্যান্ডস কোচ রোনাল্ড কোয়েমান বলেছেন, এই বিরতিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা যায়- খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দেয়াও সম্ভব। ফক্স’কে সমালোচনা করা হয়েছে কারণ তারা বিরতির সময় বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে। ফলে দর্শকরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত মিস করেছেন। 
 

৪. আমেরিকায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা নতুন উচ্চতায়
যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল, যাকে তারা ‘সকার’ বলে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়। এর ফলে মেজর লিগ সকার গড়ে ওঠে, যা বর্তমানে ৩০টি দল নিয়ে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নারী জাতীয় দল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশি সফল হলেও, নতুন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো’র অধীনে পুরুষ দলেও সমর্থন বাড়ছে। নিউ ইয়র্ক, শিকাগো এবং ওয়াশিংটন ডি.সি’তে বিশাল ম্যাচ উদ্‌যাপন দেখা যাচ্ছে। তরুণ দর্শকরা এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরমে বেশি ম্যাচ দেখছেন। ব্যাঙ্গো’র গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫-৩৪ বছর বয়সীদের ৭৫ শতাংশের বেশি একাধিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরম নিয়ে অসন্তুষ্ট। এই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি স্ট্রিম হওয়া টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে।
 

৫. দর্শকরা যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি উপভোগ করছেন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া পর্যটকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। কেউ অবাক হচ্ছেন পানীয়তে বরফ দেখে, কেউ ওয়াফেল হাউস ও হোয়াটাবার্গার খাবার উপভোগ করছেন। অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও আধুনিক স্টেডিয়াম দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। একজন ব্যবহারকারী এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া এমন স্টেডিয়াম পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। ্ত
(দ্য হিল থেকে অনুবাদ)
 

আন্তর্জাতিক'র অন্যান্য খবর