টথেরাপির কথা শোনা যায় চিকিৎসার নানা ক্ষেত্রে। রোগ উপশমের জন্য থেরাপির প্রয়োগ নতুন কিছু নয়। এমনকি সমপ্রতি মিউজিক থেরাপির মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে তোলা হচ্ছে। তাই বলে রাজনীতির অঙ্গনে যে সেই থেরাপি নতুন রূপে আবর্তিত হবে সেটা আগে জানা ছিল না।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালা বদলের পর ডিম থেরাপি শব্দবন্ধটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে রাজনীতির অঙ্গনে। সংক্রামক রোগের মতো এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ তথা আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে। রাজ্যের প্রায় সর্বত্র শুরু হয়েছে চুরি, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তৃণমূলের নেতা, জনপ্রতিনিধি ও সাবেক মন্ত্রীদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া। এই থেরাপিতে দুর্নীতি রোগের উপশম না হলেও অভিযুক্ত বা অপছন্দের নেতাকে ডিম ছুড়ে মারার মতো আত্মতৃপ্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। শুরুটা দমদমের সাংসদ সৌগত রায়কে দিয়ে। তারপর তা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। প্রধানত শাসক দলের কর্মী-সমর্থকরা বিপুল উৎসাহ নিয়ে ‘ডিম থেরাপি’র আনন্দ যজ্ঞে শামিল হয়েছেন। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তরাও ডিমের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। পুলিশের উপস্থিতিতে এই ডিমের ধাক্কা যে পুলিশের গায়ে লাগছে না তা নয়।
পুলিশের এই ডিমের হলুদ রং নিয়মিতই রঙিন হয়ে উঠছে। আর তাই এক পুলিশ কর্মী বলেছেন, ডিমের দামটা যদি বেড়ে যায় তাহলে নিষ্কৃতি পাই।
কিন্তু ডিম পুষ্টিকর উপাদান সমৃদ্ধ হলেও ডিমের এই অপচয় নিয়ে বেশ চিন্তিত নাগরিক সমাজ। কলকাতার মানিকতলা বাজারের এক ডিম ব্যবসায়ী তো সখেদে বললেন, ডিমের দাম তো বেড়েই চলেছে। আর পচা ডিম নাকি ক্রেট ক্রেট বেশি দাম দিয়ে নিতেও দ্বিধা করছেন না আত্মসুখ বিলাসী বিক্ষোভকারী জনতা। প্রতিবাদ হিসেবে অতীতে মাঝে মাঝে পচা ডিম ছোড়ার কথা আমরা শুনেছি। তবে সেটা কদাচিৎ। কিন্তু বঙ্গে রঙ বদলের পর ডিম থেরাপি যে এমন বিক্ষোভের অস্ত্রে পরিণত হবে তা আগে কেউ ভাবেনি। ফলে পচা না পেলেও কাঁচা ডিম নিয়ে মানুষ লাইন দিচ্ছেন থানা বা আদালতের দোরগোড়ায়। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তো ডিমে প্রায় লেপ্টে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। হেলমেট পরে রেহাই পেয়েছেন তিনি। এখন পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে এই পুষ্টিকর বস্তুটি ধেয়ে না এলেও তার বাড়ির সামনে দলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ ডিমের চোটে আহত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন। ডিমের আঘাতের ভয়ে তো সাবেক মন্ত্রী উদয়ন গুহকে আদালতে নিয়ে যেতে হয়েছে হেলমেট পরিয়ে।
পালাবদলের রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধে সামনে আসছে যত অভিযোগ তত বাড়ছে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা। তৃণমূল কংগ্রেস নেতার গ্রেপ্তারি মানেই ‘চোর-চোর’ স্লোগান এবং তার দিকে পচা ডিমের অভাবে কাঁচা ডিম নিক্ষেপ। কেউ বলছেন, নিখাদ রাজনীতি। আবার কেউ বলছেন, জনরোষ। ডিম নিক্ষেপ থেকে জনতাকে নিরস্ত্র না করার বদলে শাসক দলের রাজনীতিবিদরাও বেশ সুখ পাচ্ছেন। আর তাই পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের কথায় তেমনই মজার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘রাজ্যের লোকজন এত সুন্দর প্র্যাকটিস করেছে যে, ঠিক কপালে বললে কপালে মারছে, টাকে বললে মারছে টাকে। আমার মনে হয়, কোথাও প্র্যাকটিস করানো হচ্ছে।’ পুরমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর পাওয়ার পর অগ্নিমিত্রা পালও দিলীপ বাবুর সঙ্গে টক্কর দিয়ে বলেছেন, ‘এখন খাবার ডিমের চেয়ে মারার ডিমের দাম বেশি।’
অবশ্য ডিম থেরাপির শিকার হয়েছেন যে দলের নেতারা তারা কলকাতা হাইকোর্টে গিয়ে ডিম থেরাপির হাত থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তার উপায় জানতে চেয়েছেন। কেননা, ডিম থেরাপির ভয়ে বাড়ি থেকে বেরুতে চাইছেন না বিরোধী নেতাদের অনেকে। আইনজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, ডিম নিক্ষেপের মতো ঘটনা আইনের বিরোধী। তবে ডিম থেরাপির বাড়াবাড়িতে সরকার শেষপর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছেন। কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া না হলেও পুলিশকে বলা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে জনতাকে সতর্ক করতে। ফলে এমন প্রতিবাদ বন্ধ করতে এবার মাইক হাতে রাস্তায় নেমেছেন পুলিশ কর্তারা। হুগলির ডানকুনি পুরসভার এক কাউন্সিলরকে ডিম ছুড়বেন বলে জড়ো হয়েছিলেন এলাকাবাসী। তাদের সতর্ক করে ডানকুনি থানার আইসি জানান, কাউকে ডিম ছুড়ে অপদস্থ করার মধ্যে বিচার হয় না। কেউ হয়তো রাগ মেটান। কিন্তু সেটা অনভিপ্রেত এবং অনুচিত। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটা যেন নির্দিষ্ট জায়গায় জানানো হয় এবং পুলিশকে পুলিশের কাজ করতে দেয়া হয়। আইসি’র কথায়, ‘‘যার যা অসুবিধা আছে জানান। কিন্তু এটা প্রতিবাদ নয়। প্রতিবাদের নামে হুজ্জুতি করবেন না। প্রতিবাদ জানানোর পদ্ধতি আছে। কেউ অসভ্যতা করবেন না। পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।’’ এর পরেই ডিম হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা সরে পড়েন।
আসলে এই ধরনের উদ্যোগ আগেই নেয়া দরকার ছিল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিম থেরাপি প্রতিবাদের অস্ত্র হলে সমাজের সর্বস্তরে তার মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। শুধু রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেই এটা সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়, ব্যক্তিগত পরিসরেও এর প্রভাব পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ ইতিমধ্যেই শিক্ষকদের উপরেও ডিম থেরাপি শুরু হয়েছে। ্ত