ভারতের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কেনাবেচা নতুন কোনো ঘটনা নয়। ষাটের দশক থেকেই চলছে এই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কেনাবেচা। শুরুতে তা ‘আয়া রাম গয়া রাম’ বাক্যবন্ধটি রাজনীতিতে খুবই আলোচিত হয়েছিল।
তবে বর্তমানে ভারত জুড়ে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ব্যক্তিগত সাংসদ কেনাবেচার পথে না গিয়ে একীভূত দল পরিবর্তনের পথকে কাজে লাগানো হচ্ছে। আর এই কৌশলকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এক ভয়ঙ্কর খেলা শুরু করেছে দেশ জুড়ে। আসলে সংসদের দু’টি কক্ষÑ রাজ্যসভা ও লোকসভাতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্যে বিজেপি এই দলবদলের খেলা শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশে এই দল বদলের রাজনীতি এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।
ভারতের লোকসভায় ৫৪৩টি আসনের মধ্যে বর্তমানে বিজেপি’র নেতৃত্বাধীন এনডিএ’র হাতে ২৯৩টি আসন রয়েছে। ফলে লোকসভায় প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের সীমা থেকে তাদের প্রায় ৬৯টি আসন কম রয়েছে। আর এই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্যে বিজেপি বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বিদ্রোহকে কাজে লাগাতে পুরোদমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভারতে জনপ্রতিনিধি কেনাবেচার এই রাজনীতি শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। ১৯৬৭ সালে, নবগঠিত হরিয়ানা রাজ্য থেকে গয়া লাল নামে এক নির্দল বিধায়ক নির্বাচিত হন। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি তিনবার তার রাজনৈতিক দলের আনুগত্য পরিবর্তন করেন। ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনি কংগ্রেস পার্টিতে যোগ দেন, ইউনাইটেড ফ্রন্টে চলে যান এবং সন্ধ্যার মধ্যেই আবার কংগ্রেস পার্টিতে ফিরে আসেন। কংগ্রেস নেতা রাও বীরেন্দ্র সিং যখন গয়া লালকে একটি সংবাদ সম্মেলনে নিয়ে আসেন, তখন তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘গয়া রাম আব আয়া রাম হ্যায়’ (গয়া রাম এখন আয়া রাম)। এটি ভারতীয় রাজনৈতিক শব্দভা-ারে তখন থেকে একটি স্থায়ী শব্দ বন্ধ হিসেবে স্থান করে নেয়।
এই দলত্যাগের সংস্কৃতি ব্যাপক সরকারি অস্থিতিশীলতা এবং ভোটারদের রায়ের প্রতি নির্লজ্জ অবজ্ঞার জন্ম দিয়ে ভারতীয় গণতন্ত্রে সর্বনাশ তৈরির পথ প্রশস্ত করেছিল। যেহেতু নির্দল বিধায়করা ক্ষমতা বা অর্থের দ্বারা সহজেই প্রলুব্ধ হতেন, তাই প্রায়শই পুরো রাজ্য সরকারগুলোই ভেঙে পড়তো।
তবে এই বিশৃঙ্খল প্রথা বন্ধ করার লক্ষ্যে ভারতের সংসদে ১৯৮৫ সালে দলত্যাগ বিরোধী আইন পাস হয় এবং এটিকে সংবিধানের দশম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যদিও ‘আয়া রাম গয়া রাম’ শৈলীর ছোট পরিসরে ব্যক্তিগত দলত্যাগ বহুলাংশে দমন করা গিয়েছিল, কিন্তু রাজ্য বিধানসভাগুলোতে আজও দলবদলের এই প্রথা প্রচলিত রয়েছে। রাজনীতিবিদরা দলত্যাগ বিরোধী আইনকে পাশ কাটানোর জন্য ফাঁকফোকর খুঁজে বের করেছেন, প্রধানত একীভূত হওয়ার বিধানটির মাধ্যমে। কেননা, আইনটিতে একটি ব্যতিক্রমের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যদি কোনো দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একীভূত হতে সম্মত হন তাহলে তা গ্রহণযোগ্য। বর্তমানে এই কৌশলটি প্রায়শই বড় আকারে দলত্যাগের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
আর এই কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক উপঢৌকন বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি গোয়ার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গিরীশ ছো-কর বলেছেন, গোয়ায় একটি একশ’ কোটি রুপির পার্টির জন্ম হয়েছে। এই কটাক্ষের মূল লক্ষ্য বিজেপি’র প্রভাবে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে সাংসদদের গোয়া কংগ্রেস পার্টি নামে একটি দল গঠন। ২০২২ সালের গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে ৪০টি আসনের মধ্যে ২০টিতে জয়ী হয়েছিল বিজেপি। কংগ্রেস ১১টি আসনে জয়ী হয়। ভোটের পর ওই ১১ জনের মধ্য থেকে ৮ জন বিজেপিতে যোগ দেন। ফলে কংগ্রেসের বিধায়ক সংখ্যা এসে ঠেকেছিল ৩-এ। এবার তারাই নতুন দল গঠন করেছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, ১০০ কোটির এই অপারেশনে কংগ্রেস শিবির, তৃণমূল কংগ্রেস এবং আমজনতা পার্টি থেকেও অনেকে যোগ দিয়েছেন।
অভিযোগ একই পথে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসকে ভেঙে খান খান করে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও রয়েছে আর্থিক সহ নানা উপঢৌকনের প্রলোভন। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনই দলবদল করে নতুন একটি অপরিচিত দল এনসিপিআইতে যোগ দিয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের ঘোষণা এনডিএকে তারা সমর্থন জানাবে। এই দলবদলের নাটকের গোটা পর্বটি মঞ্চস্থ হয়েছে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে এবং তার বাড়িতে বসে।
এবার মহারাষ্ট্রের শিবসেনা (ইউবিটি)’র ছয়জন সাংসদ বিজেপি সমর্থিত শিবসেনার একনাথ শি-ে গোষ্ঠীতে যোগ দিতে চলেছে। এর আগেও মূল দলের পূর্ববর্তী একটি বিভাজনের পর গঠিত হয়েছিল এই শিবসেনা শি-ে দলটি। এই গোষ্ঠীটি লোকসভায় দলটির মোট সদস্য সংখ্যার ঠিক দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে গঠিত, যা তাদের একটি পরিত্রাণের পথ করে দিয়েছে। তাদের এই দলত্যাগ সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ-বিরোধী আইনের অধীনে একটি একীভূতকরণ হিসেবে গণ্য হবে।
দশম তফসিল অনুযায়ী, কোনো সদস্য স্বেচ্ছায় দল থেকে পদত্যাগ করলে বা বিধানসভায় ভোট বিভাজনের সময় দলীয় হুইপ অমান্য করলে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে। ২০০৩ সালে একটি সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটিকে আরও শক্তিশালী করা হয়, যেখানে পূর্ববর্তী ‘বিভাজন’ সংক্রান্ত বিধানটি বাতিল করা হয়- যেটি একটি দলের এক-তৃতীয়াংশ সদস্যকে কোনো শাস্তি ছাড়াই দলত্যাগের অনুমতি দিতো-এবং শুধুমাত্র ‘একীভূতকরণ’ সংক্রান্ত ব্যতিক্রমটি রাখা হয়, যার অধীনে কোনো দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক অন্য দলের সঙ্গে একীভূত হতে সম্মত হলে অযোগ্যতার বিধানটি প্রযোজ্য হয় না। প্রায় একই সঙ্গে দেশের দুই প্রান্তে বিরোধীদের ভাঙনের কাজটি সেরেছে বিজেপি। দেশের পূর্ব প্রান্তে পশ্চিমবঙ্গে যখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা তৃণমূলের বিশেষ অধিবেশন ডেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তারই তৈরি দলের চেয়ারপারসনের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার দাবি করেছেন, ঠিক তখনই দেশের পশ্চিম প্রান্তে ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছে বালাসাহেব ঠাকরে প্রতিষ্ঠিত শিব সেনা উদ্ধব দলটি। সরকারিভাবে উদ্ধব শিবিরের ৬ সাংসদ যোগ দিয়েছেন একনাথ শি-ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল’ শিব সেনায়।
দিন কয়েক আগে উদ্ধব নিজের দলের সাংসদদের বৈঠকে ডেকেছিলেন। সেই বৈঠকে হাজির হননি ৯ জন সাংসদের ৬ জন। এই ছয় সাংসদ ইতিমধ্যেই স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা শি-ে সেনার সঙ্গে দল মিশিয়ে দিতে চান। ৯ জনের মধ্যে ৬ জন অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ একসঙ্গে ওই সিদ্ধান্ত নেয়ায় তাদের দলত্যাগ বিরোধী আইনেও পড়তে হবে না।এক্স পোস্টে সঞ্জয় রাউথ দাবি করেছেন, ‘মহারাষ্ট্রের সাংসদদের কেনার জন্য প্রত্যেককে ১৫ কোটি রুপি করে অগ্রিম দেয়া হচ্ছে। এই তথ্য মর্মান্তিক এবং জঘন্য।’ একই সঙ্গে প্রাইভেট জেট দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন সঞ্জয়।
নিঃসন্দেহে তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন দলে ২০ জন সাংসদের যোগদান এবং মহারাষ্ট্রে শিবসেনার শি-ে গোষ্ঠীতে যোগদান লোকসভায় এনডিএ’র শক্তি আরও বৃদ্ধি করেছে। স্রেফ গত একমাসে ২৬ জন সাংসদ ইন্ডিয়া জোট ছেড়ে যোগ দিলো এনডিএ-তে। কিন্তু তাতেও দুই-তৃতীয়াংশের লক্ষ্যমাত্রা বিজেপি’র কাছে অনেক দূর। এবার বিজেপি’র টার্গেট সম্ভবত সমাজবাদী পার্টি এবং ডিএমকে। এ ছাড়াও আর কিছু ছোট ছোট দলের দিকে নজর রেখেছে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে।
পরিকল্পিত বিভাজনগুলোকে এখন একীভূতকরণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যার ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠী অযোগ্য ঘোষিত না হয়েই দলত্যাগ করতে পারছে। এই ধরনের দাবির আইনি বৈধতা নিজেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অতীতের একটি রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, একীভূতকরণ কেবল আইনসভার দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, বরং এতে মূল দলকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আদালত এ সংক্রান্ত বেশ কিছু সাংবিধানিক প্রশ্নের রায় আটকে রাখায় প্রিজাইডিং অফিসাররা এই ধরনের দাবিগুলোকে অবলীলায় পাস করিয়ে দিচ্ছেন এবং এই চর্চা ক্রমশ গতি পাচ্ছে।
এদিকে রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টির সাংসদদের বড় অংশ বিজেপিতে যোগ দেয়ায় রাজ্যসভায় আপ-এর সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে কমে তিনে দাঁড়িয়েছে। এদিকে রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের তিন সদস্য সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক পদত্যাগ করেছেন। এই দলবদলের হিড়িকের সম্মিলিত প্রভাবে লোকসভা ও রাজ্যসভায় শাসক এনডিএ’র শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা কেবল সংখ্যাগত বিষয় নয়, বরং তার বাইরেও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। আগামী সংসদের অধিবেশনে বিজেপি সরকার রাজ্যে আইনসভার আসনের প্রস্তাবিত সীমানা পুনঃনির্ধারণ এবং নারী সংরক্ষণ কাঠামোর মতো বড় সাংবিধানিক সংস্কারগুলো পাস করার জন্য সক্রিয়ভাবে এই দলবদলের কৌশলকে মদত দিয়ে চলেছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র এবং সংবিধানের চেতনার প্রতি একটি অবনমনের মনোভাব তৈরি হচ্ছে।