তীর্যক মন্তব্য

ন্যায়বিচারের ধারণা জোরালো করতেই হবে

হাসান মামুন | মতামত
জুলাই ১১, ২০২৬
ন্যায়বিচারের ধারণা  জোরালো করতেই হবে

দেশে ফিরে আসার পর থেকে বিএনপি নেতা তারেক রহমান প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সম্ভাব্য সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের চার মাস পরও তিনি একই কথা বললেন জুলাই শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এক সভায়। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দিল্লিতে ‘আওয়ামী লীগের দাফন’ হয়ে যাওয়ার মতো কিছু বক্তব্য দিলেও প্রধানমন্ত্রী সেদিকে যাননি। সেটাই স্বাভাবিক। তিনি তো সরকারপ্রধান। তার বক্তব্যে সরকারের সুগভীর রাজনৈতিক তথা নীতিগত অবস্থানই প্রকাশ পাবে। 
প্রধানমন্ত্রী বলতে ভোলেননি, জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ যারা এর আগে সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার অবশ্যই হবে। বিচার যে ন্যায়সঙ্গত হতে হবে, সেটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ জন্য সময় লাগলে লাগুক, এটাই তার অবস্থান। 
 

ন্যায়বিচারের আরেকটা দিক হলো, যারা যেটুকু অপরাধ করেছে, তাদের বিচার যেন সেটার মধ্যে সীমিত থাকে। অনেক মিথ্য মামলা তো হয়, যেগুলোকে আমরা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলি। এ ধরনের বেশ কিছু মামলা বর্তমান সরকারের আমলে প্রত্যাহার হয়েছে, যেগুলো বিগত হাসিনা সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে দায়ের করা হয়েছিল। তখন অগণিত হামলার পাশাপাশি হাজার হাজার উদ্দেশ্যমূলক, এমনকি ‘গায়েবি মামলা’ করা হয়েছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের নামে। 
গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ধারা অনুসৃত হয়নি, সেটাও বলা যাবে না। মূলত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নিরপরাধ নেতাকর্মীরা এর শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগ আমলে তাদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতার দায়ে সাংবাদিকসহ অনেক পেশাজীবীর নামেও মামলা দায়ের হয়েছে। এর একাংশ হয়েছে গ্রেপ্তার। দীর্ঘদিন ধরে অনেকে আছেন কারাগারে। অনেকের বিরুদ্ধে দায়ের মামলায় অগ্রগতিও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তাদের জামিন দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগও জোরালো। 
 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওই বক্তব্যের পর এই ধারায় কিছু পরিবর্তন আসবে কিনা, সেটাও লক্ষ্য করতে হবে। কিছু পরিবর্তন তো প্রত্যাশিত আর সেটা ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকেই। জামিনযোগ্য হলে জামিনের ব্যবস্থা করা; মিথ্যা কিংবা অতিরঞ্জিত মামলা হলে তা প্রত্যাহার করে নিয়ে মানুষকে হয়রানি থেকে বাঁচানো; অযথা কারও সামাজিক মর্যাদাহানি না করা; যার বিরুদ্ধে হয়তো আর্থিক অপরাধের অভিযোগ আছে, তাকে হত্যা মামলায় না জড়ানোÑ এগুলো নিশ্চিত করা হলেই ন্যায়বিচারে অনেকখানি অগ্রগতি হয়ে যাবে। 
তখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরও অনেকে এ উপলব্ধিতে পৌঁছাবে যে, সুনির্দিষ্ট অপরাধে না জড়িয়ে থাকলে কোনো ভয় নেই। দেশের সর্বস্তরের মানুষের মনেও এই ধারণা তৈরি হতে থাকবে যে, ভিন্নমত বা ভিন্ন রাজনীতি করা অপরাধ নয়। এমনকি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে যাদের পতন হয়েছে, তাদের প্রতি ‘রাজনৈতিক পক্ষপাত’ থাকাটাও অপরাধ নয়। সেটা ভুলের মধ্যে থাকা। 
যারা রাজনীতি করে ক্ষমতায় গিয়ে তা কুক্ষিগত করতে সুনির্দিষ্ট অপরাধে লিপ্ত হয়, বিশেষ কোনো আদর্শের নামে তাদের প্রতি সমর্থন জারি রাখাটা নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু এটাকেও অপরাধ বলে গণ্য করে ব্যবস্থা নেয়ার আয়োজন হলে কয়েক কোটি মানুষকে সাজা দেয়ার দিকে যেতে হবে। সেটা সমাজ ও রাজনীতিকে ঠেলে দেবে ভয়ানক অরাজকতার মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেদিকে না যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বলেই মনে হলো। এটাই প্রত্যাশিত ছিল। 
গণ-অভ্যুত্থানের পর দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনামলে কোনো ইতিবাচক কাজ হয়নি, বলা যাবে না। কিছু ক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা না থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেত বলেও অনেকে মনে করেন। অন্যান্য দেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর অভিজ্ঞতা আরও খারাপ হতে দেখা গেছে। কোনো কোনো দেশ তো গণতন্ত্রে উত্তরণের দিকেই যেতে পারেনি। অরাজকতা, সেনাশাসন, এমনকি বিদেশি হস্তক্ষেপ তাদের ভবিষ্যৎকে অধিকতর জটিলতায় নিক্ষেপ করেছে। বাংলাদেশেও সেই প্রবণতা ছিল না, তা নয়। 
সেটি জোরালো হয়ে উঠতে না পারার পেছনে মাঠে থাকা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’র ভূমিকাকে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। নির্বাচনে জনগণ তাদের সেজন্য পুরস্কৃত করেছে কিনা, সেই আলোচনাও আছে। এর পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সবাই মনে রেখেছে দেশের মাটিতে পা রেখেই বিশাল জমায়েতে দেয়া তারেক রহমানের বক্তব্য। সেখানে তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ কিংবা নিজেদের মধ্যে অহেতুক বিভক্তির বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দিকে যাওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। 
এই পথে যেতে হলে কেবল রাজনীতিতে সহিষ্ণুতার চর্চা বাড়ালে চলবে না; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সব পক্ষের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে হবে। আমরা জানি, হাসিনা সরকারের আমলে বিশেষত ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে কীভাবে প্রতিপক্ষ দমনের নামে ব্যাংকসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করা হয়েছিল। সেগুলো লুট করে অর্থ পাচারও করে দেয়া হয়। এখন সেই অর্থে অনেকে বিদেশে পলাতক অবস্থায়ও বিলাসী জীবনযাপন করছে বলে খবর রয়েছে। 
 

মুশকিল হলো, পাচারকৃত সেই অর্থসম্পদ ফিরিয়ে আনা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। পলাতকদের ফিরিয়ে এনে শাস্তি দেয়াও কঠিন; অনুপস্থিত অবস্থায় তাদের ন্যায়বিচার সম্পন্ন করা গেলেও। এ অবস্থায় যা কিছু হাতে রয়েছে, তা দিয়ে অর্থনীতিতে গতি আনাটাই জরুরি। 
ব্যবসায়ীদের মধ্যেও যারা সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত হননি, তাদের মনের ভয়ভীতি দূর করা প্রয়োজন। সেটা না হলে তারা ‘ভিন্ন উপায়ে’ ব্যবসায় সক্রিয় থাকতে চেষ্টা করবেন। সেই প্রক্রিয়ায় বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের একাংশ যুক্ত হয়ে ফায়দা লুটছে বলেও খবর পাওয়া যায়। 
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলে খুব বেশি ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী দণ্ডিত হবেন বলে মনে হয় না। অনেকের ‘অপরাধ’ প্রমাণ করাও যাবে না। আমাদের তদন্ত সক্ষমতা দ্রুত উন্নত করা তো সম্ভব নয়। অনেক বেশি মানুষকে বিচারে সোপর্দ করা হলে বিচার বিভাগেও বিপুল চাপ সৃষ্টি ও মামলা জট তৈরি হবে। 
 

এসব বলার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, চিহ্নিত অপরাধীদের ছাড় দিয়ে এড়িয়ে যেতে হবে। বরং এটা করাই সঙ্গত হবে- চিহ্নিতদের আলাদা করে যারা তাদের সমর্থক হিসেবে ভুলের বিবরে আছে, তাদেরকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে ফিরতে বলা। তাদের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন যে, তাদের নেতাদের মধ্যেও যারা পরিচ্ছন্নতার পক্ষপাতী ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আর যারা প্রকৃতই অপরাধী, তাদের বিচারও হতে হবে স্বচ্ছতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। 
সেটা নিশ্চিত করা না গেলে এখনো তাদের পক্ষাবলম্বনকারী লোকজন যে বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে, সেটা অনেককে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হবে। আওয়ামী লীগ আমলে অস্বচ্ছতার সঙ্গে হওয়া অনেক বিচার যেমন পরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তেমনটি নতুন করে ঘটা বা ঘটতে দেয়া ঠিক হবে না। 
বলা হয়ে থাকে, অন্তর্বর্তী শাসনামলেও দীর্ঘদিন সরকার অপেক্ষা করেছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনুশোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনার জন্য। সেটি না ঘটার পরই তাদের ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ করে দলটির বিচারের ব্যবস্থা করা হয় আইনে সংশোধনী এনে। দেশে দেশে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত রাজনৈতিক দলের বিচার হয়নি, তা নয়। বাংলাদেশেও সেটি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অনেকের ভিন্নমত থাকলেও বিচারিক নিষ্পত্তির ওপর সবাই আস্থা রাখতে চাইবে। 
 

এর পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনে সমস্যা কোথায়, সেটি কিন্তু বোধগম্য হচ্ছে না। সরকারের তরফ থেকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেয়া উচিত। এই কমিশন কি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর গঠিত হবে? অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা বলেছিলেন, তারা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন গঠন করবেনÑ যারা এর সুযোগ নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, তাদের জন্য। সেটা আর গঠিত হয়নি। 
এখন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়, যাদের কাজ রাজনীতির সব পক্ষকে একটা অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনা, যেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা এবং এ সম্পর্কিত অধিকারগুলো সবাই ভোগ করবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্থিতি ও সংহতির জন্য ক্ষতিকর, এমন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে অবস্থান করে যে যার পছন্দ অনুযায়ী রাজনীতি করবে। জনগণের কাছে যাবে এবং পরস্পরের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিযোগিতা করবে। 

 

কেবল জুলাই হত্যাকাণ্ড নয়; এর আগেও যারা বিভিন্ন পর্যায়ে গুম-খুনসহ অপরাধে লিপ্ত হয়েছে, তাদের বিচারে কারও আপত্তি থাকতে পারে না। থাকলে সেটা গ্রাহ্য করার প্রয়োজন নেই। বিচার ভণ্ডুলের চেষ্টা হলে সেটাও বানচাল করে দিতে হবে। সেটাও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করারই পথ। সম্ভাব্য বিভ্রান্তি এড়াতে এটা আবারো বলছি নিবন্ধের শেষে এসে। 
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তাতে কেউ দলীয় প্রতীকে অংশ না নেয়ায় সব মত-পথের নিরপরাধ মানুষই অংশ নিতে পারবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এটা ‘রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি’র দিকে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া হতে যাচ্ছে; যদি সরকার সেখানে অযাচিত চাপ সৃষ্টি না হওয়ার পরিবেশ রক্ষা করতে পারে। 
স্থানীয় নির্বাচনে অনেক বেশি হানাহানির ‘ঐতিহ্য’ও আমাদের রয়েছে। সেজন্য নির্বাচনে যাওয়ার আগে অপরাধ দমনে বড় অগ্রগতি আনতে হবে। সহনশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি হবে না আইনের শাসন জোরদার না হলে। এটা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করার প্রশ্ন নয়; নিজ দলের মধ্যেকার উপদলেও সহনশীলতা যেন বজায় থাকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘নিজেদের মধ্যে হানাহানি’ও কম হয়নি। প্রতিপক্ষ মাঠে না থাকলে অবশ্য সেটা বেশি করে ঘটতেই দেখা যায়। 
নির্বাচনের পর দেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতা কমবে বলে অনেকে আশা করেছিলেন। ‘মব’ কমবে বলেও প্রত্যাশা ছিল। সেটা কতোখানি ঘটেছে, তা সরকারেরও ভালো করে জানা। এর সব কিছুই কিন্তু সহনশীলতার পরিবেশ ও ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধ উপাদান এবং গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো বাড়তে দিলে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও নতুন করে সংকটগ্রস্ত হতে পারে। বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তির জন্যও সবার প্রতি ন্যায়বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি জোরালো করার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। 
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

 

মতামত'র অন্যান্য খবর