ফিরে দেখা

জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতর-বাহির

শামীমুল হক | মতামত
জুলাই ১১, ২০২৬
জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতর-বাহির

জুলাই বাংলাদেশে অষ্টম আশ্চর্য হিসেবে ব্যক্তিকে ঠাঁই করে নিয়েছে। আর তিনি হলেন- শেখ হাসিনা। যাকে বিশ্বের নামিদামি মিডিয়া নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচার আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু কেন অষ্টম আশ্চর্য? যিনি কথায় কথায় বলতেন হাসিনা কখনো পালায় না। আওয়ামী লীগ কখনো পালায় না। যিনি কথায় কথায় বলতেন এদেশে বিএনপি-জামায়াত আর কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এ মুহূর্তে এই দু’টি বিষয় নিয়েই আলোচনায় আসা যাক। প্রথমত. শেখ হাসিনা নিষ্ঠুরতমভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যা গোটা বিশ্বের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। যেভাবে দেশকে তিনি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন, যেভাবে তিনি নিজেকে বলতে গেলে সৃষ্টিকর্তার কাতারে নিয়ে গিয়েছিলেন তা বলাইবাহুল্য। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা যা বলতেন তা হতো। তা করেই ছাড়তেন। কথিত আছে, নব্বই দশকে দুই নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার মধ্যে একটি মৌখিক চুক্তি হয়েছিল। ক্ষমতায় গেলে কেউ কাউকে জেলে নেবে না। ক্ষমতায় গিয়ে খালেদা জিয়া এ কথা মনে রেখেছেন। কিন্তু হাসিনা! বেমালুম ভুলে গিয়ে খালেদা জিয়াকে শুধু জেলেই পুরেননি, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না দিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দেশকে এক চরম অরাজকতার দিকে ঠেলে দেন শেখ হাসিনা। সচিব থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের টেনে আনেন জনতার মঞ্চে। এটা করে এই প্রথম শেখ হাসিনা প্রশাসনে রাজনীতির বীজ বপন করেন। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘ পনের বছরের হাসিনা শাসনামলের ফিরিস্তি লিখলে পনের হাজার পৃষ্ঠায়ও শেষ হবে না। এর সবই দেশের মানুষ জানেন। যিনি পালিয়ে যায় না বলে দম্ভ করতেন, তিনি কীভাবে পালালেন তা দেখে দেশের মানুষ তো বটেই গোটা বিশ্ব হতভম্ব। অথচ ঘুর্ণাক্ষরেও কেউ বুঝতে পারেননিÑ ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবেন চুপিসারে। তার নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ঠেলে তিনি পালিয়ে গেলেন। এর আগে শেখ হাসিনা তার স্বজনদের দেশ থেকে বের করে দিয়েছেন নিরাপদে। হাসিনার এই পালিয়ে যাওয়া নির্মম একটা সত্য প্রকাশ করে যে, যতই ক্ষমতাধর হোন দেশের আমজনতার কাছে সেই ক্ষমতা কিছুই না। হয়তো আমজনতা কিছু সময় নির্যাতন আর নিপীড়নের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। কিন্তু যেদিন জেগে উঠেন জনতা সেদিন ক্ষমতার মসনদ চুরমার হয়ে যায়। যুগ যুগ ধরে মানুষ এমনটা দেখে আসছে। 

 

কিন্তু কথায় বলে নাÑইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আদিম যুগ থেকে এই অত্যাধুনিক যুগে এসে শেখ হাসিনা এটাই প্রমাণ করে গেলেন। চিরদিন ক্ষমতায় থাকার যে মতলব এঁটেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে জনতা সেই মতলবকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে ২০২৪-এর জুলাইয়ের আন্দোলনে। পৃথিবী যতদিন থাকবে, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে এই জুলাই ইতিহাস হয়ে থাকবে। কারণ জুলাই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। এ জুলাইয়ে সরকারি বাহিনী বিশেষ করে পুলিশের যে আচরণ তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। প্রকাশ্যে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা, শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত নন কোথাও কোথাও পুলিশের গাড়িতে তুলে লাশ পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটেছে। এমন নিষ্ঠুরতা নিজ দেশের জনগণের ওপর চালানো আরেক ইতিহাস। 
আচ্ছা, জুলাইয়ে কোটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন শাহবাগে দানা বাঁধে তখন কি কেউ ভেবেছিলেন এ আন্দোলনই দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করবে? না, এমনটা কেউ ভাবনাতেই আনেন নি। তাহলে এমন পর্যায়ে কেন গেল? এখানেও শেখ হাসিনার কু-বুদ্ধি কাজ করেছে। চালাকি কাজ করেছে। তিনি মনে করেছিলেন পনের বছর যেভাবে দেশকে নাচিয়েছেন এখনো এমনটা করে পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু আল্লাহর মাইর দুনিয়ার বাইর। সৃষ্টিকর্তা সহ্য করতে পারেন নি। আর না হয়, ক’জন ছাত্রই নেমেছিল কোটাবিরোধী আন্দোলনে? এটা সামাল দিতে গিয়ে কতো নাটক যে করতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে সবই তার বিপরীতে গেছে। জনতাকে আরও উস্কে দিয়েছে। 

 

প্রথম আঘাতটা আসে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে। তিনি আন্দোলনের এক পর্যায়ে হুমকি দিয়ে বলেন, এ আন্দোলন দমন করতে আমার ছাত্রলীগই যথেষ্ট। তার এই উস্কানি পেয়ে ছাত্রলীগ পরদিনই আন্দোলরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলে পড়ে। পিটিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া করার চেষ্টা করে। কিন্তু ছাত্র-জনতা ক্ষেপে গিয়ে ছাত্রলীগকেই হল ও ক্যাম্পাস ছাড়া করে। ওবায়দুল কাদেরের এ উস্কানি আন্দোলনকারীদের মনে দ্রোহ জাগিয়ে তুলে। আর এরপরই শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য এ দ্রোহের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলে বসেন রাজাকারের নাতিপুতি।  গণভবনের সেই বক্তব্যে মুহূর্তে গোটা দেশে আগুন জ্বলে উঠে। রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে স্লোগান ছিলÑতুমি কে, আমি কে-রাজাকার, রাজাকার। কে বলেছে, কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার। আন্দোলনের আগুন গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আর রক্ষা নেই। রাজধানী ঢাকা আন্দোলনকারীদের দখলে। এরই মধ্যে নাটক চলে আরেক দফা। আন্দোলনকারী কয়েক নেতাকে গুম করে ফেলা হয়। তীব্র আন্দোলনের মুখে তাদের আবার ছেড়ে দেয়া হয়। গুম করে তাদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। তারা ভর্তি হন হাসপাতালে। ওদিকে ডিবি হারুন আরেক নাটক করে বসেন। হাসপাতাল ও বাসা থেকে ছয়জনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে তার কায়দায় নির্যাতন চালাতে থাকেন। আবার ডিবিতে হারুনের ক্যান্টিনে তাদের নিয়ে ভাত খাওয়ার চিত্রও ভাইরাল করেন। এক পর্যায়ে তাদের দিয়ে মিথ্যা বয়ানও দেয়া হয়। চাপের মুখে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। ওদিকে ৯ দফা, ৮ দফা নিয়ে আন্দোলনকারী নেতাদের মধ্যে দ্বিমতের সুর উঠে। এরইমধ্যে সামনে চলে আসে একদফা। সরকারের পদত্যাগ। কোথা থেকে কি হয়ে গেল সরকার প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। সারা দেশে আনন্দের বন্যা। মিষ্টির দোকানে মিষ্টি নেই। আবালবৃদ্ধবনিতাসহ সকল শ্রেণির মানুষ রাস্তায় উল্লাসে মত্ত। নাহিদ, হাসনাত, সার্জিস, সজীব, আখতাররা সামনের সারিতে থাকলেও এ আন্দোলন ছিল গোটা দেশের। সকল রাজনৈতিক দলের। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডনে বসে তার সকল কৌশল অবলম্বন করেছেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। জামায়াত আন্দোলন সক্রিয় রাখতে ঢাকার পয়েন্টে পয়েন্টে নানা কৌশল খাটিয়েছে। আর সরকার স্থল ও আকাশ পথে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছে। যা বাস্তবায়ন হয়েছে। এ আন্দোলনে অকাতরে জীবন দিয়েছে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ। জাতিসংঘ বলেছে ১ হাজার ৪শ’র বেশি মানুষ জীবন দিয়েছে। এরই মধ্যে ৫ই আগস্ট অর্থাৎ ৩৬শে জুলাই হাসিনা পালিয়ে যান দেশ ছেড়ে। দুর্ভাগ্য তাদেরÑ যারা হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে কতো কু-কর্ম করেছে তাদের কাউকে বলে যাননি। যে যেদিকে পারে পালিয়েছেন। তাদের এ পালিয়ে যাওয়াই বলে দেয় তারা অপরাধী। চরম অপরাধী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। ইতিমধ্যে এক মামলায় শেখ হাসিনার ফাঁসি হয়েছে। কয়েকটি মামলার রায় দেয়া হয়েছে। এসব মামলা দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাকÑ সেটাই চায় দেশবাসী। 
 

কিন্তু এখনো শেখ হাসিনার কিছু অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ায়। সেই একই সুর। যেখানে হুমকি, হত্যার নির্দেশ। তিনি ফিরে এসে এসবের বিচার করার প্রতিজ্ঞা। এসব শুনে মানুষ হাসে। আমজনতা বলেÑময়লা যায় না ধুইলে, খাসিয়ত যায় না মরলে। 
জুলাই আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে তা যদি বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ সরকার ভুলে যান তাহলে তাদেরও একসময় এমন দশা হতে পারেÑএমনটা বলছেন অনেকেই। তবে আশার কথা জুলাই আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়ে দিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান একই সুরে বলেছেন জুলাইয়ের একক দাবিদার কেউ নন। এর দাবিদার গোটা দেশবাসী। নতুন সরকার গঠন হয়েছে পাঁচ মাস প্রায়। এ সময়ে দু’টি সংসদ দেখেছে দেশবাসী। এ সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের যে বুঝাপড়া তাতে দেশের মানুষ আশান্বিত যে, দেশ সুন্দরভাবে এগিয়ে যাবে। কিছু বিষয় নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত হয়েছে বটে। কিন্তু এটাই তো সংসদের সৌন্দর্য। ওদিকে আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার ফিরে এসেছে। অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। জুলাই সনদ নিয়ে সামান্য দূরত্ব রয়েছে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে। মানুষের বিশ্বাস এ দূরত্বও কমে যাবে। দেশ এগিয়ে যাবে। সরকার প্রধানের অনেক কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতারও অনেক কর্মকাণ্ডে মানুষ বাহবা দিয়েছে। দেশের মানুষ আর স্বৈরাচারের শাসন দেখতে চায় না। তারা চায় পূর্ণ গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্র দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সামনে। অনেক দূর। 
 

মতামত'র অন্যান্য খবর