ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের ঠিক দুই বছরের মাথায় আমরা দাঁড়িয়ে। রক্তাক্ত এই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে নানা হিসাবনিকাশ। আঠারো মাস একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার কাটিয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল জনরায়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে ছয় মাস হতে চললো। ’২৪-এর আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশ কেমন চলছে? বাঁধভাঙা স্রোতের মতো রাজপথে নেমে আসা লাখো তরুণ যুবাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ কোন পথে এগোচ্ছে? ’২৪-এর নজিরবিহীন আন্দোলনের লক্ষ্যইবা কতোটা পূরণ হচ্ছে? এ নিয়ে অন্তহীন জিজ্ঞাসা চারপাশে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন যেমন শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে ’২৪-এর গণ-আন্দোলনও তেমনি এই মানচিত্রে নজিরবিহীন এক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। এই আন্দোলনের বড় বিশেষত্ব ছিল এটি নেতৃত্ব ছাপিয়ে হয়ে উঠেছিল গণ-মানুষের আন্দোলন। কারা কোথায় নেতৃত্ব দিয়েছে সেটা ভুলে যার যার মতো করে দেশ জুড়ে প্রবল প্রতিবাদী ঢেউ তুলেছিল সাধারণ মানুষ। যার তোড়ে ফ্যাসিবাদী মসনদ ঠিকতে পারেনি। অনেকটা বালির বাঁধের মতো ভেসে যায় ৫ই আগস্টে।
এই আন্দোলনে মানুষের প্রথম আকাক্সক্ষা ছিল ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান। অতীতের অন্যায়, অপশাসন থেকে মুক্তি। সেটি ৫ই আগস্টের অগ্নিময় দুপুরেই নিশ্চিত হয়ে যায়। আন্দোলনে অংশ নেয়া মানুষজনের আরও অনেক দাবির মধ্যেÑ বৈষম্য বিলোপ, একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল অন্যতম। ’২৪ পরবর্তী অধ্যায় মানুষের এই দাবিগুলো পূরণে ঐতিহাসিক এক সুযোগ তৈরি করে দেয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে নানা অঘটন ঘটেছে। রাজনৈতিক বিপর্যয় এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে সংস্কার ও সমঝোতার নানা সুযোগ এসেছে। কিন্তু ’২৪-এর মতো এর আগে এত বড় পরিবর্তন ও সংস্কারের সুযোগ কখনো আসেনি। কিন্তু সেই সুযোগ কতোটা কাজে লাগিয়েছে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো সেই প্রশ্ন এখন জোরালো হচ্ছে।
অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল তখনই। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলো ড. ইউনূসের উপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বোধহয় প্রথম এবং বড় ভুলটি করেছিল। ড. ইউনূস নিজের মতো করে একটি এনজিও-নির্ভর সরকার গঠন করেছিলেন যার ফলশ্রুতিতে সময়ে সময়ে শুধু বিতর্ক বেড়েছে। আন্দোলনের শক্তি ও আকাক্সক্ষা ধারণ না করে তাদের অনেকে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন। যার ফলে আঠারো মাস পর অনেকটা অগোছালো অবস্থায় থেকেই একটি নির্বাচন দিয়ে তাদের সরে যেতে হয়েছে। ছাত্র নেতৃত্বের প্রতিনিধিদের সরকারে রাখা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। যে উদ্দেশ্যে তাদের সরকারে রাখা হয়েছিল তা পূরণে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। হাজারো মানুষের রক্তের উপর দাঁড়ানোর সরকারের দায় এবং দায়িত্ব কি তারাও তা বেমালুম ভুলতে বসেছিলেন। ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন নিজেদের ক্ষমতা আর সুবিধা আদায়ে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। সেই ছাত্র প্রতিনিধিদের এখন ইউনূস সরকারের অন্য উপদেষ্টাদের ওপর নানাবিধ দায় চাপাতে দেখা যায়। কিন্তু তারা কেন সরকারে থেকে অন্যদের জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে পারলেন না, চাপ তৈরি করতে পারলেন না, সরকারের ব্যর্থতা এবং পথচ্যুতির তথ্য জনগণকে সময়মতো জানাতে পারলেন না এর দায় ছাত্র উপদেষ্টারা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। এমন নানা দায় এবং প্রশ্ন সামনে রেখে প্রতি বছরই জুলাই আমাদের সামনে হাজির হবে। রাজনৈতিক দল এবং সরকারের প্রতি একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেবে।
অনেকে বলেন, ‘জুলাই’ মাসটি বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির গতিপথ, ভাষা এবং ক্ষমতার সমীকরণকে আমূল বদলে দিয়েছে। রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী সময়ে এই মাসটিকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক মেরূকরণ তৈরি হয়েছে তা আগামীর রাজনীতির গতিপথও ঠিক করে দেবে। জুলাইয়ের মাধ্যমে অতীতের রাজনীতির অনেক কিছুই বাতিল হয়ে গেছে। যা আর ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরুতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তা ছিল কেবলই একটি সাধারণ সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। যা মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চরমমাত্রার অহমিকা ও দম্ভ, দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে নির্বিচারে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পুরো আন্দোলনকে অগ্নিগর্ভ করে তোলে। আবু সাঈদ, মুগ্ধদের মতো শত শত তরুণের বুক পেতে দেয়া এবং আত্মত্যাগ পুরো দেশের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাজপথে নামতে বাধ্য করে। শহরের রাজপথ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম সবখানেই সাধারণ মানুষ নেমে আসেন শিক্ষার্থীদের সমর্থনে। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মধ্যদিয়ে এই আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও, এর মূল মনস্তাত্ত্বিক ও রাজপথের আন্দোলনটি শক্তি সঞ্চয় করেছিল পুরো জুলাই মাস জুড়ে। ফলে, এই দেশের মানুষের কাছে ‘জুলাই’ এখন আর কেবল একটি ইংরেজি ক্যালেন্ডারের মাস নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অধ্যায়, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন এবং জনতার অপরাজেয় শক্তির প্রতীক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
এই জুলাই দেশের রাজনীতির পটে বড় পরিবর্তন এনেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঝড়ে এই জুলাইয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের সঙ্গে দেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি। ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। অন্য শীর্ষ নেতারাও রায়ের অপেক্ষায়। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
এর বিপরীতে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন করে টিকে থাকা বিএনপি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। বহু নির্যাতন আর নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অবস্থানের প্রশ্নে বরাবরই কোণঠাসা হয়ে থাকা জামায়াতে ইসলামী নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্বর্ণালী সময় পার করছে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিজেদের অনেক চাওয়া পাওয়াই তারা পূরণ করতে পেরেছে। নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে হতাশ হলেও প্রথমবার বিরোধী দলের সারিতে বসার বড় অর্জন এসেছে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফরম রাজনৈতিক দলে রূপ নেয়া জাতীয় নাগরিক পার্টিও বিরোধী দলের অংশ হতে পেরেছে। আত্মপ্রকাশের পর এত অল্প সময়ে এমন বড় সাফল্য আর ক’টা দল দেখাতে পেরেছে? দুই পক্ষের এই অর্জন এবং বিসর্জনের বিপরীতে এখন সবচেয়ে বড় যে বিতর্কটি রাজনীতির মাঠে তা হলো এই জুলাইয়ের দাবিদার নিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলো জুলাইয়ের সুবিধা পাচ্ছে বা নিচ্ছে। একেক দল একেকভাবে জুলাইকে নিজেদের দাবি করছে। জুলাইয়ের অর্জনকে নিজের অনুকূলে ব্যবহারের এক তীব্র প্রতিযোগিতাও দেখা যাচ্ছে। আসছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। যার সুযোগে পতিত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। হাজারো ছাত্র-জনতাকে হত্যার ঘৃণ্য অপরাধের জন্য কোনো ধরনের অনুশোচনা না করে উল্টো দলটির পক্ষ থেকে জুলাই মাসের পুরো ঘটনাপ্রবাহকে একটি ‘পরিকল্পিত বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বা ‘নাশকতা’ হিসেবে নির্লজ্জ বয়ান দেয়া হচ্ছে।
সাধারণ মানুষ এবং ছাত্ররা যে আকাক্সক্ষা নিয়ে জুলাই মাসে রাজপথে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিল, তা ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, স্বাধীন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তারা চেয়েছিল এমন এক বাংলাদেশ যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার হবে না, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং প্রতিটি নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার পাবে।
কিন্তু এই আকাক্সক্ষা ঘিরে বাস্তবতা এখন নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারও মতে রাজনীতিতে ‘জুলাই’ এখন এক রাজনৈতিক ঘুঁটি বা হাতিয়ার হয়ে উঠেছে কোনো কোনো দলের জন্য। জুলাইয়ের চেতনাকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করছে তারা। যে চেষ্টা অবশ্য হালে পানি পায়নি।
দীর্ঘ আন্দোলনের পথ বেয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি অবশ্য বলছে, তারা জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেই সরকার পরিচালনা করবে। জনগণের আকাক্সক্ষা এবং জুলাইয়ে জীবন দেয়া ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা পূরণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। রাষ্ট্র সংস্কার এবং পরিবর্তনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে করা জুলাই সনদ বাস্তবায়নেও দলটি ইতিবাচক কথা বলছে। যদিও তাদের কিছু বিষয়ে ভিন্নমত এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় গড়া পৃথক সচিবালয় বাতিল করার ঘটনা তাদের এই সদিচ্ছা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
জুলাইয়ের আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেয়াদের অনেকের এখন প্রশ্ন এই বিশাল আত্মত্যাগের পর রাষ্ট্র কি আসলেই বদলাচ্ছে, নাকি কেবলই ক্ষমতার চেহারার পরিবর্তন ঘটছে? বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো ‘উইনার টেকস অল’ বা ‘যে জেতে সে-ই সব পায়’। অর্থাৎ, ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেন, তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে। জুলাইয়ের মূল স্পিরিট ছিল এই সংস্কৃতির অবসান ঘটানো। পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা। কিন্তু অভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় মানুষের এই দাবিগুলো কতোটা জারি আছে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
জুলাই সনদ তৈরির প্রক্রিয়া ও এর বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে। এই সনদ তৈরিতে এক ধরনের চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতা ছিল অন্তবর্তী সরকারের। যার কারণে অনেক ইস্যুতে দলগুলো একমত হতে পারেনি। কেউ কেউ ভিন্নমত দিয়েছে। যা সনদে উল্লেখ আছে। বিএনপিও তাদের ভিন্নমত নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে দিয়েছে। যা সনদের অংশ। এখন বিএনপি এই ভিন্নমত বাদ দিয়েই সনদ বাস্তবায়ন করবে এটিই স্বাভাবিক। এতে কারও প্রশ্ন তোলার সুযোগও নেই। কিন্তু সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিএনপি ভিন্ন কৌশল বা এড়িয়ে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করলে সেটি অভ্যুত্থানের অন্য পক্ষগুলোর জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বিএনপি নেতৃত্ব হয়তো বিরোধীদের হাতে এই অস্ত্র তুলে দিতে চাইবেন না। অন্যদিকে জামায়াত সহ বিরোধী দল জুলাইকে ব্যবহার করে জুলাই সনদের নামে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে যাচ্ছে। হতে পারে এটি তাদের রাজনৈতিক কৌশল। সরকারি দলকে পথে রাখতে বিরোধীদের এই চাপ সঙ্গতও। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলের নামে অতি বাড়াবাড়ি রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে যেকোনো মুহূর্তে ঘোলাটে করে তুলতে পারে।
বোদ্ধারা বলছেন, জুলাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। জুলাইয়ের অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল, তেমনি ছিল মাদ্রাসার ছাত্র, স্কুলের কিশোর, রিকশাচালক, পোশাক শ্রমিক এবং সাধারণ গৃহিণী। এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের বড় অংশগ্রহণ যেমন ছিল তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই ছিল বড় শক্তি। এই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের সমগ্র শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। তাই জুলাই নিয়ে যে রাজনৈতিক রশি টানাটনি আমরা দেখছি, তা যদি কেবল নিজেদের দলীয় স্বার্থে বা ক্ষমতার ভাগাভাগির উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা এই আন্দোলনের মূল আকাক্সক্ষাকেই চিরতরে ধ্বংস করে দেবে।‘জুলাই’-এর প্রকৃত রাজনীতি হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ফ্যাসিবাদের নামে অতীতে হওয়া জুলুম-নির্যাতনের বিচার এবং জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের স্বপ্নের প্রকৃত বাস্তবায়ন। ন্যায্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, লাখ লাখ বেকার তরুণ যুবাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা। এই দায় অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া সব দল এবং পক্ষের।
রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, দেশের মানুষ এখন আর অন্ধ নয়। জুলাই তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। জুলাইয়ের তপ্ত পরিস্থিতিতে বুলেট বোমা আর নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষ যে সাহস দেখিয়েছে, সেই মানুষরা কিন্তু ঘুমিয়ে নেই। মানুষ সব দেখছে। সব বিবেচনা করছে। সরকার, বিরোধী দলসহ সবার প্রতি জুলাই পাহাড়সম দায়িত্ব রেখে গেছে। তাদের কারোরই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দায় এড়িয়ে অতীতের পুরনো রাজনীতিতে ফেরার যেকোনো চেষ্টা হলে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না।