চলতি প্রসঙ্গ

পোশাক খাত সুস্থির করতে উদ্যোক্তাদের করণীয়

হাসান মামুন | মতামত
নভেম্বর ৭, ২০২৬
পোশাক খাত সুস্থির করতে উদ্যোক্তাদের করণীয়

তৈরি পোশাক খাতে মজুরি বোর্ড গঠনে সরকার দেরি করে ফেলেছে কিনা, সেই তর্ক করে এখন আর লাভ নেই। ন্যূনতম মজুরি ও নতুন মজুরি কাঠামোর দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠার মধ্যেই ১লা নভেম্বর পোশাক খাতে মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। পরিস্থিতির চাপে দ্রুত তারা বৈঠকেও বসেছেন। তার চেয়ে বড় কথা, সেখান থেকে একটা ইতিবাচক ঘোষণা এসেছে।
 

ডিসেম্বরের মধ্যেই মজুরি বোর্ড তার কাজ সম্পন্ন করবে। আর সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী, ডিসেম্বর থেকেই কার্যকর হবে নতুন মজুরি। শ্রমিকরা তা পাবেন জানুয়ারিতে। অর্থাৎ যে মজুরিই স্থির হোক, সেটা পাওয়া যাবে ডিসেম্বর থেকে।
বোর্ডের সামনে এখন বড় কাজ শ্রমিক পক্ষের সুনির্দিষ্ট দাবি হাতে পাওয়া এবং সেই বিষয়ে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের অবস্থান জানা। নিরপেক্ষ প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে বোর্ডে। তার বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হবে বলে আশা। তারপর বোর্ড একটি প্রস্তাব পেশ করবে মন্ত্রণালয়ে। সেটা স্বভাবতই যাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত আশা করা যায়, সবাই মেনে নেবেন।
এর আগ পর্যন্ত নানান দিক থেকে প্রস্তাব আসবে। আলোচনা চলবে। বোর্ড গঠিত হয়েছে বলে এর বাইরে কোনো আলোচনা আর চলবে না, সেটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। তবে ভালো হয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো উস্কানিমূলক কথাবার্তা পরিহার করে দায়িত্বপূর্ণ বক্তব্য দিলে। বিশেষ করে দায়িত্বশীল মহল। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, পোশাক শিল্পমালিকদের মধ্যে অগ্রগণ্য কারও উচিত হবে না শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্য করা। এতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির নতুন করে অবনতি হতে পারে, যেটা কাম্য নয়।
 

এরই মধ্যে পোশাক খাতের একাংশে কম সংঘাত হয়নি। এটা সম্ভবত এড়ানো যেত হাতে অনেকটা সময় নিয়ে মজুরি বোর্ড গঠন করলে। আর সেই কাজটাই আগে করলে। অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর কাজটি আগে শুরু না করলে। সমাজে কিন্তু এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা সেই খবর রাখেন না, তা হতে পারে না। তা সত্ত্বেও যে কারণেই হোক, সরকার ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ বলে পরিচিতদের বর্ধিত বেতন কার্যকর করতে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতেও শুরু করেছে। পোশাক খাতে মজুরি বোর্ড গঠনের দিন ১লা নভেম্বর থেকে সেই বেতন দেয়া শুরুও হয়েছে। আর সেটা কার্যকর হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে। কে জানে, ওইদিন শ্রমিক বিক্ষোভ যে সহিংস হয়ে উঠলো; তার একটা কারণ হয়তো সেই ঘটনা।
 

পোশাক খাতে মজুরি বৃদ্ধির আগ দিয়ে সব সময়েই অবশ্য কিছু না কিছু বিক্ষোভ হয়েছে। অতীতে বরং তাদেরকে অনেক বেশি লড়াই করতে হয়েছে রাজপথে। এবার তাও ভালো, একটি দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর ঘটনা বাদে রক্তক্ষয় হয়নি। পুলিশ কিছু অপেশাদার আচরণ করলেও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। তবে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠলে এটাকে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহারের যে অভিযোগ তোলা হয়; সেটা এবারো হয়েছে। এবার তো প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। একটি রাজনৈতিক দল গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রয়েছে পলাতক অবস্থায়। তার নেতৃত্ব দেশের বাইরে। অভিযোগ উঠেছে, তারা শ্রমিক বিক্ষোভে সহিংসতার উপাদান যুক্ত করছে।
 

এসব অভিযোগ তোলার প্রয়োজনই হতো না, যদি পোশাক শ্রমিকদের দাবি আদায়ে মাঠে নামতেই না হতো। সরকার শ্রমিক বিক্ষোভকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অভিযোগে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া যেতেই পারে। সেটা প্রত্যাশিতও। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যেন এতে সংকটে না পড়ে। প্রতিষ্ঠান মানে, তাতে কর্মরত নিরীহ ব্যক্তিরা। আর চক্রান্তমূলক কিছু ঘটে থাকলে পুলিশের গোয়েন্দারা কেন আগেভাগে সরকারকে তথ্য জোগাতে পারেনি, সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে।
 

এখন প্রধান কাজ পরিস্থিতি শান্ত করে আনা। প্রকৃত শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে আনা। আন্দোলনের চাপে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো খুলে দেয়া। তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজারে এরই মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে খারাপ খবর গেছে। এখন পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করে এনে বিপরীত বার্তা দিতে হবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমাদের রপ্তানি আয়ে কিন্তু প্রবৃদ্ধি খারাপ নয়। আর তৈরি পোশাকই তো প্রধান রপ্তানি পণ্য। তবে পোশাক খাতে অস্থিরতা দূর করা না গেলে আমাদের উদ্যোক্তাদের ওপর আস্থা কমবে আর এর সুযোগ নেবে প্রতিযোগীরা। তারা কোনো কারণে সংকটে পড়লে আমরাও এর সুযোগ নিতাম। এটাই বাজারের নিষ্ঠুর নিয়ম। সে কারণে এমন অভিযোগও করা হয়ে থাকে যে, আন্তর্জাতিক বাজারের কোনো কোনো প্রতিযোগীও চাইছে আমাদের এ খাতটিকে অস্থির করতে। সেটা ঠিক হয়ে থাকলে তো এ বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল শুধু সরকার নয়; উদ্যোক্তা পক্ষেরও।
 

এখন আসলে উদ্যোক্তাদের ঠিক করতে হবে, তারা কেমন মজুরি কাঠামোয় যেতে প্রস্তুত। সর্বশেষ ২০২৩ সালে শ্রমিকদের ভেতর থেকে ন্যূনতম মজুরি বিষয়ে যেসব দাবি উঠেছিল, বলা যায় তা অর্ধেক মজুরি নির্ধারিত হয়। পোশাক শ্রমিকরা আপত্তিসহ তা মেনে নিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটা ইতিবাচক ঘটনা অবশ্য ঘটেছে। সেটা হলো পাঁচ বছরের বদলে তিন বছর পরপর মজুরি হালনাগাদের ব্যবস্থা হওয়া। এ জন্য অন্তর্বর্তী ও বিএনপি উভয় সরকার প্রশংসা পাবে। আসলে তো উচিত প্রতি বছর শেষে মজুরি হালনাগাদের স্থায়ী ব্যবস্থায় যাওয়া। আর যেসব খাতে ন্যূনতম মজুরির কাঠামোই নেই, সেগুলোকে দ্রুত এর আওতায় আনা। এটাও মনে রাখা চাই, আমাদের শ্রমশক্তির ৮০ শতাংশেরও বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। তাদেরকে কোনো মজুরি কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগও কার্যত অনুপস্থিত। চাহিদা ও জোগানের ঘাত-প্রতিঘাতেই সেখানে যা হওয়ার হবে।
 

পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি মানে একজন অভিজ্ঞতাহীন শ্রমিক শুরুতে যে মজুরি পাবেন, সেটা। দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মজুরি বাড়তে থাকে। রয়েছে ওভারটাইম করে আয় বাড়ানোর ব্যবস্থাও। প্রায় সব শ্রমিকই সেই সুযোগ নিয়ে থাকেন। নইলে তো বর্তমান সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরিতে শহর-বন্দর এলাকায় কারও পক্ষে টিকে থাকাই অসম্ভব। আর শ্রমিক তো গবাদিপশু নয়। খাবারের বাইরেও তার কিছু চাহিদা রয়েছে। বস্তি, সেমি-বস্তিতেও ভাড়া মোটেও কম নয়। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবহন ভাড়া দুম করে বেড়ে গেছে। আর অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা ব্যয় কোত্থেকে আসে, সেটাও গুরুতর প্রশ্ন। তবে শ্রমিক পরিবারগুলো টিকে থাকে প্রায় সবাই মিলে উপার্জন করে। সংগ্রামমুখর সেই জীবনের কাহিনী মিডিয়াতেও বড় একটা আসে না। পোশাক খাতে ক্রমে নারী শ্রমিক কমে পুরুষের সংখ্যা বাড়ছে। অটোমেশনের চাপে শ্রমিক নিয়োগও আগের মতো বাড়ছে না। ছাঁটাইও অব্যাহত। একটু বয়স্ক শ্রমিকরা এর আওতায় পড়ে যাচ্ছেন। তাদেরকে তখন আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এসে ঢুকতে হচ্ছে। কী তাদের ভবিষ্যৎ? তাদের সন্তানদেরই বা কী ভবিষ্যৎ? এইসব প্রশ্নের নিষ্পত্তির কিছুটাও কি হবে নবগঠিত মজুরি বোর্ডে?
 

এ খাতের উদ্যোক্তাদের ‘পেইন’ও কম নেই। তবে মজুরি বোর্ড সেটার নিষ্পত্তির জায়গা নয়। তাদের শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে। রাজনৈতিকভাবেও তারা কম প্রভাবশালী নন। প্রধান রপ্তানি খাত যারা পরিচালনা করেন, সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের প্রভাব থাকারই কথা। সেটা তারা কোন কাজে কতোখানি ব্যবহার করবেন, সেদিকেও দৃষ্টি থাকবে। আপাতত আমরা খুশি হবো শ্রমিকদের ভেতর থেকে ওঠা দাবি বিবেচনায় নিয়ে তারা একটা গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামোর বিষয়ে দ্রুত একমত হলে।
 

পোশাক খাতে যে উৎপাদন খরচ, তাতে শ্রমিকের জন্য ব্যয় কিন্তু বেশি নয়। হিসাবে দেখা গেছে, এটা বড়জোর ১৫ শতাংশ। অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা পারেন দক্ষতা বাড়িয়ে খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে। সেটা না পেরে বিপুলভাবে উপস্থিত একটা দুর্বল জনগোষ্ঠীকে কায়ক্লেশে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা অটুট রাখার মনোবৃত্তি তারা আর ধারণ করেন না, এই বার্তা এবার দেয়া প্রয়োজন। এতে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছেও তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। এটা করে বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও তারা হয়তো অপেক্ষাকৃত ভালো দাম চাইতে পারবেন। গ্রহণযোগ্য মজুরি পেলে শ্রমিকদের কাজে মনোযোগ আর উৎপাদনশীলতা বাড়বে। এতেও খাতটি সুস্থির হওয়ার আশা।
 

পোশাক খাতে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার বিস্তৃত হতে না দিয়েও উদ্যোক্তারা কিন্তু দিনের শেষে লাভবান হননি। সেই উপলব্ধি থেকে তাদের উচিত হবে এ ক্ষেত্রেও অবস্থান দ্রুত বদলানো। সত্যিকারের ট্রেড ইউনিয়নের চর্চা থাকলে দু’পক্ষের মতপার্থক্য আর বিরোধের ইস্যুগুলোর দ্রুত আর গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তিও সহজ হতো।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

 

মতামত'র অন্যান্য খবর