সাফ কথা

সংবিধান সংস্কার না কমিটি কমিটি খেলা

সোহরাব হাসান | মতামত
নভেম্বর ৭, ২০২৬
সংবিধান সংস্কার না  কমিটি কমিটি খেলা

সংবিধান সংস্কার না সংশোধন-এই বিতর্কে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট শুরু থেকে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল এবং এখনো আছে। বিরোধী দলের দাবি ছিল, সাংবিধানিক আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা। তারা জাতীয় সংসদ সদস্যের পাশাপাশি পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন। কিন্তু বিএনপি ও এর মিত্র দলের সদস্যরা শুধু জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এই অবস্থায় সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি অনেকটা সরকারি দলের মর্জির ওপর নির্ভর করে। এর প্রতিবাদে বিরোধী দল সংসদে কয়েক দফা ওয়াক আউটের পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনও চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো যে  জুলাই সনদে সই করেছে এবং গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন কীভাবে হবে? সনদ ও গণভোটের রায়ের মধ্যে অসংগতি থাকলে তার মীমাংসার উপায় কী। যতই দিন যাচ্ছে, ততই সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যকার দূরত্ব বাড়ছে। এক্ষেত্রে যদি দুই পক্ষ অনড় থাকে এবং ছাড় দিতে না চায় তাহলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে, যাতে বিএনপি’র ৭ জন, মিত্র দলের ৫ জন ও বিরোধী দলের ৫ জনকে রাখা হয়। কিন্তু বিরোধী দল থেকে কোনো নাম না দেয়ায়  সরকারি দল ও মিত্রদের নিয়েই কমিটির কার্যক্রম চলছে। ইতিমধ্যে বিশেষ কমিটি সংবিধান বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। সর্বশেষ তারা যে ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে, তাতে বিরোধী দলের সমর্থক ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কেউ অংশ নেননি।  
 

এরই মধ্যে বিরোধী দল ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের’ দাবিতে রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি ১৫ সদস্যের জাতীয় সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করেছে। এতে আছেন
জামায়াতের নায়েবে আমীর ও সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ১১ দলীয় ঐক্যের প্রধান সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং জুলাই শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা ও সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি (সূত্র:আগামীর সময়)।
 

এতদিন বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা করা হয়েছিল যে, বিরোধী দল সংবিধান সংস্কার দাবি করলেও সাংগঠনিক কোনো উদ্যোগ নেয়নি, তারা রাজপথে সভা-সমাবেশের মধ্যেই তাদের তৎপরতা সীমিত রেখেছে। অন্যদিকে সরকারি দল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা প্রায় শেষ করে এসেছে।  এই সমালোচনার মুখে বিরোধী দল সংবিধান সংস্কারে তাদের কাঠামোগত উদ্যোগকে সামনে আনলো।
১১ দলীয় জোট বলেছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করার জন্যই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর বিরোধী জোটের দাবি ছিল, জনগণের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শুধু সংসদীয় সংশোধন কমিটির মাধ্যমে এগোনো হলে তা গণরায়ের যথাযথ প্রতিফলন হবে না।
 

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ গ্রহণ করা হয়। পরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দেন। বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেয়ার বিধান ছিল। বিএনপি’র সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্যরা উভয় শপথ নেন। বিএনপি সরকার বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার পক্ষে। বিশেষ কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপন করার কথা। কিন্তু এখনো বিরোধী দলের সঙ্গে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। তবে বিশেষ কমিটির একাধিক সদস্য বলেছেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনা না হলেও অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়েছে। তারা মনে করেন, বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। কমিটির বৈঠকে না এলেও জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপিত হওয়ার পরও তাদের আলোচনার সুযোগ থাকবে। সরকারি দলের এই আশাবাদ একটু বেশি বলে মনে হচ্ছে। সংসদে বিল উত্থাপিত হওয়ার আগেই বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ কমিটি যে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে, তাদের বেশির ভাগ বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সমাধানে আসার কথা বলেছেন। কেননা, সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীজনদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি চলতে থাকলে জুলাই-বিরোধী শক্তিই লাভবান হবে।
 

ইতিমধ্যে সরকারি ও বিরোধী দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে পতিত স্বৈরাচারের সঙ্গে হাত মেলানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মাধ্যমেই তারাই পতিত রাজনৈতিক শক্তিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন। আগে আওয়ামী লীগ নেতারা বক্তৃতা শুরু করতেন বিএনপি দিয়ে শেষও করতেন বিএনপি দিয়ে। এখন বিএনপি নেতাদের মধ্যেও এই বাতিক লক্ষ্য করা গেছে।  তবে এর মধ্যেও কিছু কিছু আশার কথা শোনা যাচ্ছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কিছু চাপিয়ে দিতে চান না। জুলাই সনদের নোট অফ ডিসেন্ট বা আপত্তি নিয়েও কারও আপত্তি থাকলে সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।  অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রচণ্ড মতবিরোধ আছে। সরকারি দল বলেছে, নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যের সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি, ভোটের আনুপাতিক হারে এটি গঠিত হবে। বিরোধী দল রাজি হলে সরকারি দল এক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিতে চায় বলে জানানো হয়েছে। তাদের প্রস্তাব অর্ধেক সদস্য আনুপাতিক হারে এবং অর্ধেক সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচিত হতে পারে। বিরোধী দল আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
দায়িত্ব নেয়ার পরই বিএনপি সরকারকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। জ্বালানি সংকটের ধাক্কা জনজীবনকে মারাত্মক বিপদে ফেলেছে। খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় বেকারত্ব অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত দুর্বল থাকায় অর্থনীতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। যেই মানুষের জন্য  গণতন্ত্র, জুলাই সনদ, গণভোট, সংস্কার ইত্যাদি, সেই মানুষ যে ভালো নেই, সে কথা মানতে হবে  সরকার ও বিরোধী দলকে। রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা না করে তারা যদি অনন্তকাল ঝগড়াঝাটি করতে থাকেন, তাহলে জনগণ তাদের প্রতিও অনাস্থা জানাতে বাধ্য হবে। 

 

মতামত'র অন্যান্য খবর