বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন কখনো রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে সংঘটিত হয়, কখনো জনগণের ব্যালটের রায়ে। গণ-অভ্যুত্থানে জনগণ রাজপথে নেমে স্বৈরশাসন, কর্তৃত্ববাদ ও ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে জীবন ও রক্ত বিসর্জন দিয়ে প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। অন্যদিকে নির্বাচনও ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনগণের এক ধরনের অভ্যুত্থান- যেখানে অস্ত্রের পরিবর্তে ব্যালট, রক্তপাতের পরিবর্তে গণরায় এবং রাজপথের পরিবর্তে ভোটকেন্দ্র হয়ে ওঠে ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার। গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের রক্ত ঝরে, আর নির্বাচন হচ্ছে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামপ্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচন এই রক্তপাতহীন গণ-অভ্যুত্থানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে শুধু মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটেনি, বিশ্বরাজনীতিতেও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণের এই নির্বাচনী রায় কি কেবল ক্ষমতাসীনদের প্রতি অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর মধ্যদিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিশ্বক্ষমতার বিন্যাসেও নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে?
ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান এবং তার দ্বিতীয় দফার রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দম্ভ, একতরফা সিদ্ধান্ত, বাণিজ্যযুদ্ধ, শুল্ক আরোপ, মিত্রদের সঙ্গে বিরোধ এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি কার্যত অনেক ক্ষেত্রে মিত্ররাষ্ট্রের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তির ইচ্ছা যখন প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনা ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার ওপর প্রাধান্য পেতে শুরু করে, তখন তার প্রভাব শুধু একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বশক্তির রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত যুদ্ধ, শান্তি, জ্বালানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। ফলে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কখনো কখনো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কনীতির অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এসব সংকটের দায় এককভাবে কোনো একজনের ওপর আরোপ করা না গেলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও নীতিগত অবস্থান এসব সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। মার্কিন জনগণের নির্বাচনী রায়ে সেই নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটেছে।
নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো, ডেমোক্রেটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। ফলে ট্রাম্পের হাতে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে এখন থেকে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মুখোমুখি হতে হবে। কংগ্রেসের কমিটিগুলো তদন্ত করতে পারবে, প্রশাসনের সিদ্ধান্তের জবাবদিহি চাইতে পারবে এবং যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতির অর্থায়ন নিয়েও চাপ সৃষ্টি করতে পারবে।
এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে নির্বাচনের ফলাফলকে তার রাষ্ট্রপতিত্বের অবসান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি ২০২৮ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকবেন এবং পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তার উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। সুতরাং মার্কিন রাজনীতিতে এখন যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা মূলত বিভক্ত সরকারব্যবস্থার (উরারফবফ এড়াবৎহসবহঃ) বাস্তবতা। একদিকে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান প্রশাসন, অন্যদিকে ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেস। এই দুই ক্ষমতাকেন্দ্রের সংঘাত ও সমঝোতার মধ্যদিয়েই আগামী দুই বছরের মার্কিন রাজনীতি পরিচালিত হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: মার্কিন জনগণ কি শুধু জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিবাদ করেছে, নাকি ট্রাম্পের সামগ্রিক রাজনৈতিক দর্শন ও ক্ষমতা প্রয়োগের ধরনকেও প্রত্যাখ্যান করেছে? নির্বাচনের ফলাফল থেকে উভয় ধরনের অসন্তোষের উপস্থিতি বোঝা যায়। তবে এটিকে ডেমোক্রেটদের সব নীতির প্রতি জনগণের নিঃশর্ত সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বরং এটি ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনার একটি গণতান্ত্রিক রায়।
এই নির্বাচনের ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, ইউরোপীয় নিরাপত্তা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত, ইরান এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রশ্নে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হবে। ডেমোক্রেটদের একটি অংশ ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থন পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত এবং ন্যাটোর প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের নীতি, ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নিয়ে ডেমোক্রেটদের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে।
অতএব, কংগ্রেসের ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির তাৎক্ষণিক পরিবর্তন নয়। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের কারণে ট্রাম্প এখনো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে তার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য বেড়ে যাবে। বিশেষত যুদ্ধের অর্থায়ন, সামরিক সহায়তা, কূটনৈতিক নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতিতে কংগ্রেসের বিরোধিতা তার জন্য নতুন সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব চীন, রাশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো কীভাবে গ্রহণ করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের নতুন সুযোগ দেখবে, কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অধিকতর স্বনির্ভর হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করবে। রাশিয়া ও চীন মার্কিন অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ খুঁজতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা এখনো ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
এখানে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত এক দশকে রিপাবলিকান রাজনীতি অনেকাংশে ট্রাম্পকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল। তার রাজনৈতিক দর্শন, ব্যক্তিগত নেতৃত্ব এবং গঅএঅ আন্দোলন দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর দলটির ভেতরে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও নীতির প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ২০২৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে ডেমোক্রেটদেরও শুধু ট্রাম্প বিরোধিতার ওপর নির্ভর না করে একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প রাষ্ট্রদর্শন ও শাসননীতি উপস্থাপন করতে হবে।
বিশ্বের ক্ষমতার পরিবর্তনের এই সময়ে রাজপথের গণ-অভ্যুত্থান এবং ব্যালটের গণরায়ের মধ্যে একটি মৌলিক সম্পর্ক রয়েছে। উভয়ের উৎস জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা। রাজপথে মানুষ যখন প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রের বৈধতা ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসে। আর ব্যালটের মাধ্যমে মানুষ যখন ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাখ্যান করে, তখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতর থেকেই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়। পদ্ধতি ভিন্ন হলেও উভয় ক্ষেত্রেই জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস হিসেবে নিজের অবস্থান ঘোষণা করে।
আমেরিকার জনগণ এবার ব্যালটের মাধ্যমে সেই অবস্থানই স্পষ্ট করেছে। তারা ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্বের অবসান ঘটায়নি, কিন্তু তার রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই রায়ের তাৎপর্য শুধু ট্রাম্পের জন্য নয়; বিশ্বের সব ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের জন্যও একটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে-রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, জনগণের আস্থা ও সম্মতির ওপরই তার বৈধতা নির্ভরশীল।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঔদ্ধত্য, এককেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা সৃষ্টিকারী নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের এই অবস্থান বিশ্বরাজনীতিতে স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু সেই স্বস্তি বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেবে কিনা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। বরং ট্রাম্প নির্বাচনী ধাক্কায় সংযত হবেন, নাকি অবশিষ্ট দুই বছরের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে আরও কঠোর ও একতরফা নীতি গ্রহণ করবেন, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয়।
সব মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচনকে কেবল একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। এটি বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। রাজপথের গণ-অভ্যুত্থান যেমন প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোকে বদলে দেয়ার শক্তি ধারণ করে, তেমনি ব্যালটও ক্ষমতার ঔদ্ধত্যকে নিয়ন্ত্রণ করার ঐতিহাসিক সামর্থ্য রাখে।
ট্রাম্প যুগের অবসান ঘটেছে কিনা, তা ইতিহাসই নির্ধারণ করবে। কিন্তু তার রাজনৈতিক আধিপত্য যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিবর্তন বিশ্বরাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ সৃষ্টি করবে কিনা, যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসানে কূটনীতির নতুন পথ উন্মুক্ত করবে কিনা, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে কিনা-তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, বিশ্ব কি আবার ব্যক্তির ঔদ্ধত্যের পরিবর্তে জনগণের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শান্তির রাজনীতির দিকে ফিরে যেতে পারবে?
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
faraizees@gmail.com