অগণতান্ত্রিক সমাজে সাধারণত যার হাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ থাকে, রাজনৈতিক ক্ষমতাও তার হাতেই সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত হয়। আবার এর উল্টোটাও ঘটে। অর্থ আছে বলেই তারা রাজনীতিতে যোগ দেন, আর রাজনীতিতে যোগ দেয়ার পর আরও বেশি অর্থসম্পদের মালিক হন। দীর্ঘদিন ধরে আমি সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করতাম, রাজনীতিতে দুর্নীতি এবং অর্থের প্রভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার আপসকামী হয়ে পড়ার মতো ঘটনা মূলত অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলোতেই ঘটে। আমার বিশ্বাস পুরোপুরি ভুল ছিল না।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে গর্বিত গণতন্ত্র বলে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র যে মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলোর অন্যতম আবাসস্থল, তা বুঝতে আমার বহু বছর লেগেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী করা হয়েছিল দাসদের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু কোনো একভাবে এই সংশোধনীর ভাষাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হলো, যেন এর মাধ্যমে মার্কিন করপোরেশনগুলোর স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের সিটিজেনস ইউনাইটেড মামলার পর নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার, দুর্নীতি ছড়ানো এবং কার্যত মার্কিন গণতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে দেয়ার উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রায় কোনো সীমাই অবশিষ্ট নেই।
ইলন মাস্ক এবং নৈতিকতাহীন আরও কয়েকজন ধনকুবের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার জন্য লাখ লাখ ডলার ব্যয় করতে ব্যস্ত। তারা মাস্ককে প্রতিভাবান বলে অভিহিত করেন। আমার মনে হয়, তার একমাত্র বুদ্ধিমত্তা হলো- মার্কিন নির্বাচনে অর্থের ভূমিকা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছেন এবং কীভাবে সেই বাস্তবতাকে নিজের সুবিধায় কাজে লাগানো যায়, সেটিও তিনি জানেন। এই মুহূর্তে তিনি ঠিক সেটাই করছেন।
অগণতান্ত্রিক সমাজে জনমতের কোনো গুরুত্ব থাকে না বলে জনমতকে নিজেদের পক্ষে ঘোরাতে কেউ অর্থ বা শ্রম ব্যয় করে না। কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতাধর নেতা নিজের আর্থিক স্বার্থ এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের স্বার্থ এগিয়ে নিতে যা প্রয়োজন, তা-ই করতে পারেন। কিন্তু নিজেদের সবচেয়ে গর্বিত গণতন্ত্র বলে দাবি করা দেশটির পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে জনগণের ভোট দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। আমার ধারণা, জনগণের হাতে অবশিষ্ট ক্ষমতা বলতে এটুকুই। তাই তাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণেই অপপ্রচার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।
ইলন মাস্কের মতো প্রশ্নবিদ্ধ নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা নির্বাচনে যে অর্থ ব্যয় করেন, তার উদ্দেশ্য ঠিক এটাই- অপপ্রচারে ঠাসা বার্তা দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো। লক্ষ্য হলো, এমন একটি নাগরিক সমাজ তৈরি করা, যেখানে মানুষ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের নিজেদের কোম্পানির জন্য সরকারের বিপুল সহায়তা প্রয়োজন। এই সহায়তা আসে ভর্তুকি আকারে। একই সঙ্গে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা যাতে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সেটিও তারা চান। কারণ টেসলা তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। আর এসব ভর্তুকির চেক লেখার ক্ষমতা রয়েছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে।
এখানেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থী এবং ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের মধ্যকার সম্পর্ক ভয়াবহ ও অশুভ রূপ ধারণ করে। মাস্ক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর সামনে একটি সহজ সমঝোতার প্রস্তাব রাখেন: আমি চটকদার বিজ্ঞাপন তৈরির পেছনে অর্থ ব্যয় করে অপপ্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে সাহায্য করবো, আর বিনিময়ে আপনি আমার কোম্পানিগুলোর জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করবেন, যেগুলো অন্যথায় ধুঁকতে থাকা অবস্থায় রয়েছে। অন্য কথায়, আমি আপনাকে ভোট চুরি করতে সাহায্য করবো, আর আপনি আমাকে জনগণের অর্থ চুরি করতে সাহায্য করবেন। আমি আপনাকে জনগণকে তাদের নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ভোট দিতে প্ররোচিত করতে সাহায্য করবো, আর আপনি আমাকে সেই জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবেন, যারা আপনাকে নির্বাচিত করেছে। আমি আপনাকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া ভোটারসমাজ তৈরি করতে সাহায্য করবো, আর আপনি নিশ্চিত করবেন, আমার এই বিনিয়োগ থেকে অভাবনীয় বিপুল মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়।
এটি মোটেও অতিরঞ্জন নয়। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচিত করতে সহায়তার জন্য ইলন মাস্ক প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। এরপর তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়ে যায়। হিসাবটা মিলিয়ে দেখুন।
তিনি সরকারি কর্মচারীদের নিজের ব্যক্তিগত দাসে পরিণত করেন, যারা তার ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করেন। এসব ঘটনার প্রতিটি বিষয়ে প্রমাণ না থাকলেও- যদিও প্রমাণ রয়েছে- একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: বড় বড় করপোরেশন কিংবা ধনকুবেররা কেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করার জন্য লাখ লাখ ডলার ব্যয় করেন?
এর কারণ কি এই যে, এসব ধনকুবের মার্কিন গণতন্ত্রের সুস্থতা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং কেবল পিতৃসুলভ দায়িত্ববোধ থেকে জনগণ ও দেশকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন? উপরের শেষ বাক্যটি যেমন কল্পকাহিনি, ইসরাইলের নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপনের দাবিও ঠিক তেমনই কল্পকাহিনি।
(অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন থেকে অনুবাদ)