বিশ্বের নানা প্রান্তে জেন-জি আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকাতেও জেন-জি আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। কয়েক জায়গায় জেন-জি’র আন্দোলনের ধাক্কায় সরকার বদলও হয়েছে। জেন-জি’র এই আন্দোলন হচ্ছে নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে। কোথাও তা স্বতঃস্ফূর্ত, আবার কোথাও পরিকল্পিত।
ভারতেও জেন-জি তেলাপোকার মোড়কে আবির্ভূত হয়েছে। আর সেই তেলাপোকারাই আন্দোলনের মঞ্চে প্রথম আবির্ভাবেই সরকারকে মাথা নত করতে বাধ্য করেছে। তেলাপোকা জনতা পার্টি তথা সিজেপি’র উত্থান ছিল লক্ষণীয়। এটি শুরু হয়েছিল একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফরম হিসেবে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়, যেখানে তিনি দেশটির বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। সে কারণেই এই প্ল্যাটফরমটি তৈরি হয়েছিল।
গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ (পাবলিক রিলেশনস) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী অভিজিৎ দীপকে ‘সিজেপি’ ওয়েবসাইট এবং এর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো তৈরি করেন, যা নিয়ে প্রথম আলোচনার সৃষ্টি হয়। তবে এই কাজটিকে তিনি একটি ‘ব্যঙ্গাত্মক প্রয়াস’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু অল্প সময়েই এটি ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিদ্যমান ব্যাপক অসন্তোষকে ধারণ করে দ্রুত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
অনেকের মতে, অভিজিৎ দীপকের অতীত অভিজ্ঞতাই তাকে ভারতে ফিরে এসে আন্দোলন শুরু করার প্রেরণা দিয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীপকে আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলটির সোশ্যাল মিডিয়া টিমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। আবার এই আপ পার্টি ২০১১ সালে অহিংসবাদী আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের সূত্রেই রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিল।
সিজেপি শুরুতেই গরম ইস্যু পেয়ে গিয়েছিল। নিট পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে হাতিয়ার করে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আসলে ভারতের কর্মক্ষম জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। এ ছাড়া, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্কুল পাস করা তরুণদের প্রায় ৪০ শতাংশই বেকার। এই তরুণদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব এতটাই তীব্র ছিল যে, তারা যেকোনো সলতের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। সেই সলতেতেই সিজেপি আগুন দিতে পেরেছে। তাদের দুই সপ্তাহের বেশি আন্দোলন তরুণদের এতটাই আলোড়িত করেছিল যে, দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার ছাত্র যুবক আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। সরকারও তরুণদের দাবির প্রতি প্রথমে অবহেলা ও উপেক্ষার পথ নিলেও একসময় তারা বিপদ টের পেয়ে যায়। গায়ের জোরে সেই আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করে। সেটাও ফলপ্রসূ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আর এই পদত্যাগের মধ্যদিয়ে সেই দফার আন্দোলনের সমাপ্তি হয়েছিল। যদিও সিজেপি’র সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনা। রাজ্যে রাজ্যে স্কুলগুলোর দুরবস্থা সামনে নিয়ে আসার জন্য সরজমিন পরিদর্শন শুরু করলেও তাদের অনেক ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে আপাতভাবে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল তেলাপোকারা।
তবে ভোটার তালিকা তথা এসআইআর প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের প্রতিবাদে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনকে হাতিয়ার করে সিজেপি সমান্তরাল আন্দোলন শুরু করেছে। সেই আন্দোলনেও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ নজরে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পারস্পরিক সমন্বয় রেখে সেই আন্দোলন পরিচালিত হলেও সিজেপি নেতারা নিরপেক্ষতা রেখেই চলতে চাইছে। আর তাই সমপ্রতি দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ সমাবেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েও সিজেপি তাতে যোগ দেয়নি। সিজেপি’র যুক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, তারা নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। সেই পথটি কেবল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য উন্মুক্ত। আর সিজেপি নিবন্ধনের জন্য আবেদনও করেনি। সুতরাং, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের যে সদস্যরা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, তাদের সঙ্গে সিজেপি-কে একই মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়।
প্রশ্ন হলো ভারতের রাজনীতিতে তেলাপোকাদের তথা তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা কী হবে? তারা কি রাজনৈতিক দলগুলোকে এড়িয়ে আন্দোলনকে তীব্র করে তুলতে পারবেন? বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তেলাপোকাদের আন্দোলনকে অবলম্বন করতে চাইলেও রাজনীতির ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে সিজেপিতে। কিন্তু বিজেপি সরকার সিজেপিকে ঠেকাতে যেকোনো কৌশল নিতে পারে। কেননা, বিজেপি গণতান্ত্রিক ভিন্নমতকে হেয়প্রতিপন্ন করতে এবং ভারতে সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে এসব কৌশল ব্যবহার করে। বিনায়ক সেন, উমর খালিদ, জি এন সাইবাবা, স্ট্যান স্বামী, সোনি সোরি, সুধা ভরদ্বাজ এবং ভারতের আরও অনেক আদর্শবাদী তরুণ ও শিক্ষার্থীকে কারণ ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। এদের একমাত্র ‘অপরাধ’ হলো-গণতন্ত্রকে আরও অর্থবহ করার লক্ষ্যে ক্ষমতার সমালোচনা করা, সরকারকে জনগণের জন্য কাজ করার কথা মনে করিয়ে দেয়া এবং শাসকগোষ্ঠী ও করপোরেট জগতের মধ্যকার আঁতাতকে জনসমক্ষে তুলে ধরা। গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে লড়াই করার কারণে এই ধরনের কর্মীদের ‘দেশদ্রোহি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
সিজেপি’র বিরুদ্ধেও এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যেই সিজেপি নেতাদের আইনি লড়াইয়ে আটকে রাখার চেষ্টা হয়েছে। সিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে বিদেশি অর্থ নেয়া এবং বিদেশি উস্কানির মাধ্যমে অরাজকতা তৈরির চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং অভিযোগ করেছেন, সিজেপি এবং এর শীর্ষ নেতারা ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিদেশি অলাভজনক সংস্থা ও ভারতবিরোধী বিভিন্ন নেটওয়ার্ক থেকে অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করছে। জিতেন্দ্র সিং সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, সিজেপি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন এবং আশুতোষ রাঙ্কা পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে অর্থ পেয়েছেন। যদিও এক বিবৃতিতে সিজেপি এই অভিযোগগুলোর নিন্দা জানিয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি “লজ্জাজনক বাস্তবতা” বলে অভিহিত করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যা খুশি তাই বলতে পারেন এবং কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই পার পেয়ে যান। ঠিক এই কারণেই আজ সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিদের কথারও কোনো মূল্য নেই।”
তেলাপোকা জনতা পার্টির নেতারা সমাজমাধ্যমে সক্রিয় থেকে কতোদূর আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন তা আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ভারতের বিজেপি দল ক্ষমতায় টিকে থাকলেও নানা সংকটে তারা জর্জরিত। বিজেপি’র জনপ্রিয়তাও অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। একদিকে অর্থনৈতিক চাপ এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিগুলোই ভারতের যুব আন্দোলনের মূল কারণ। তবে এর মানে এই নয় যে, ভারতও অন্যান্য দেশের মতো ‘জেন-জি’ বিপ্লবের পথে হাঁটবে।
ভারতের রাজনীতিতে অনেকেরই ধারণা, বিদ্যমান ব্যবস্থাটি সহজাতভাবেই অন্যায্য; এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতায় জর্জরিত এবং তরুণদের চাহিদার প্রতি উদাসীন। ফলে রাষ্ট্রের বয়ানের বিপরীতে একটি বিকল্প বয়ান উঠে আসছে। কিন্তু তা পরিবর্তনের পথ কীভাবে তৈরি করবে তা নিয়ে নানা মত রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে বামপন্থি দলগুলো ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দলগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতি, করপোরেট পুঁজিবাদ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা এবং ব্রাহ্মণবাদী সামাজিক বিন্যাসের উপর নির্ভর করে। আর স্বাভাবিক ভাবেই তরুণ প্রজন্ম এর বিরোধিতায় সবচেয়ে বেশি সরব। সিজেপি’র মধ্যেও এই মত অনেকটাই শক্তিশালী। ফলে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে আন্দোলন পরিচালিত করলেও তাদের হাতিয়ার হবে না।
তবে এটা ঠিক যে, ভারতের রাজনীতিতে এদের প্রভাবকে উপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। আর তাই বিজেপি’র মতাদর্শগত অভিভাবক হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বিজেপি নেতাদের পথ বাতলে দিয়েছেন। আরএসএস বিশ্বাস করে যে, তরুণদের অভিযোগগুলোকে দেশবিরোধী বলে উড়িয়ে না দিয়ে, আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করা উচিত।
তেলাপোকাদের আন্দোলনের কারণে সরকার বেশ চাপে পড়েছে। এর ফলে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা কিংবা সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের মতো বিতর্কিত নীতিগুলোর ক্ষেত্রে সরকার এখন কিছুটা ধীরগতি অবলম্বন করছে। এ বছর ৬টি রাজ্যে রয়েছে বিধানসভা নির্বাচন এবং আগামী ২০২৯ সালে হবে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন। সেই নির্বাচনের দিকে লক্ষ্য রেখে বিজেপিকে ঘুঁটি সাজাতে হচ্ছে। বিজেপি মনে করে, সিজেপি’র আন্দোলনগুলো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য প্রয়োজনীয় সুসংহত ও সমন্বিত বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে পারবে না। তবে বিজেপি’র জনসমর্থন বা ম্যান্ডেটকে খর্ব করার মতো একটি বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে।