১লা নভেম্বর ২০০৭ সালে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগে আলাদা করা হলেও দীর্ঘকাল এর পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন আটকে ছিল। ৩০শে নভেম্বর ২০২৫ সালে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারির মাধ্যমে বিচার বিভাগ দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র স্বাধীনতা লাভ করেছে।
কেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জরুরি, তা অনুধাবণ করা দরকার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিছক অলংকার নয়। নাগরিকের অধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান শর্ত। যে রাষ্ট্রে বিচারক নির্বাহী বিভাগের অনুগ্রহ, রাজনৈতিক ক্ষমতার চাপ কিংবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা নিয়ে বিচার করেন, সেখানে সংবিধানে স্বাধীন বিচার বিভাগের ঘোষণা থাকলেও নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দুর্বল হয়ে পড়ে। অতীতে বহু ফরমায়েশি বা চাপ-দিয়ে রায় প্রদানের ঘটনা সুশাসনের জন্য কলঙ্ক হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্করণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। এই অঙ্গীকারের অর্থ শুধু বিচারক ও নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব আলাদা করা নয়। এর গভীর তাৎপর্য হলো-বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রশাসন, নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিমালা, শৃঙ্খলা, বাজেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এমন স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে কোনো সরকার বা ক্ষমতাকেন্দ্র বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে না পারে।
সংবিধানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সময় লেগেছে কয়েক দশক। এই দীর্ঘ বিলম্বই প্রশ্ন তোলে-আমরা কি সত্যিই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চেয়েছি, নাকি স্বাধীনতার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতিকে রাজনৈতিক প্রয়োজনের কাছে বারবার স্থগিত রেখেছি? এসব প্রশ্নের উত্তরের জন্য ইতিহাসের দিকে তাকানো যেতে পারে। বিচার বিভাগ পৃথক্করণের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৯৯৫ সালে দায়ের করা মাসদার হোসেন মামলা। তৎকালীন বিচারক মাসদার হোসেনের নেতৃত্বে অধস্তন আদালতের ৪৪১ জন বিচারক বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র মর্যাদা ও চাকরির শর্তসংক্রান্ত প্রশ্নে রিট আবেদন করেন। মামলাটি প্রথমে হাইকোর্ট বিভাগে এবং পরে আপিল বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
১৯৯৯ সালের ২রা ডিসেম্বর আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি মৌলিক নীতিগত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে। আদালত স্পষ্ট করে দেয়, বিচার বিভাগীয় সার্ভিস প্রজাতন্ত্রের অন্য নির্বাহী ও প্রশাসনিক সার্ভিসের মতো নয়। এটি কাঠামোগত ও কার্যগতভাবে স্বতন্ত্র। বিচারকদের প্রশাসনিক ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত করা কিংবা তাদের চাকরির শর্ত নির্বাহী বিভাগের সাধারণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সাংবিধানিক স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালত বিচার বিভাগ পৃথক্করণের লক্ষ্যে সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেয়।
এই নির্দেশনাগুলোর তাৎপর্য কেবল একটি পৃথক চাকরিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা নয়। এর মধ্যে ছিল বিচার বিভাগীয় নিয়োগের জন্য স্বতন্ত্র কমিশন, বিচারকদের বেতন ও চাকরির শর্ত নির্ধারণে পৃথক ব্যবস্থা, অধস্তন আদালতের ওপর সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠা এবং বিচারকদের শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অবসান। অর্থাৎ আদালত বুঝিয়ে দিয়েছিল, বিচার বিভাগকে স্বাধীন করতে হলে শুধু বিচারিক কাজের স্বাধীনতা নয়, বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনও নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু রায় বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল প্রকট। বিভিন্ন সময়ে সরকার বাস্তবায়নের জন্য সময় নিয়েছে, আপত্তি জানিয়েছে, আবার আংশিক পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে। শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের ১লা নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিচার বিভাগ পৃথক্করণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। বিচার বিভাগীয় সার্ভিসের জন্য পৃথক নিয়োগব্যবস্থা ও বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব আলাদা করা হয়। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু পৃথক্করণের আনুষ্ঠানিক সূচনা আর বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি পরবর্তী প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের একটি বড় অভিযোগ ছিল, অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে। ফলে বিচারক বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন হলেও তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের আশঙ্কা থেকে যায়।
এই বাস্তবতায় ২০২৪ সালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিচার বিভাগের সংস্কার ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তুলে ধরেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৩০শে নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির অধীনে থাকবে। অধস্তন আদালতের কাঠামো, জনবল, নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সচিবালয়ের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিধানও রয়েছে।
তবে অধ্যাদেশ জারি হওয়া এবং এর সব বিধান বাস্তবে কার্যকর হওয়া এক কথা নয়। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশের অধিকাংশ বিধান তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হলেও অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ৭ ধারার কার্যকারিতা সচিবালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এখানে আরও একটি মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা নির্ধারিত। অন্যদিকে ১১৬ ক অনুচ্ছেদে বিচারিক দায়িত্ব পালনে বিচারকদের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। ফলে সচিবালয়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংবিধানের এই বিধানগুলোর সঙ্গে অধ্যাদেশের সম্পর্ক সুস্পষ্ট করা জরুরি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় একটি ভুল ধারণা প্রায়ই দেখা যায়। মনে করা হয়, নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হলেই বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়ে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি আরও গভীর। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অন্তত তিনটি স্তরে নিশ্চিত করতে হয়। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা-বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রশাসন, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বাধীনতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচারিক স্বাধীনতা-বিচারক কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার, প্রশাসন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির নির্দেশ বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। কোনো মামলার রায় হবে আইন, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। তৃতীয়ত, বিচারকের ব্যক্তিগত ও পেশাগত স্বাধীনতা-বিচারককে এমন নিরাপত্তা দিতে হবে, যাতে তিনি কোনো অজনপ্রিয় বা ক্ষমতাসীনদের স্বার্থবিরোধী রায় দেয়ার কারণে বদলি, হয়রানি, পদোন্নতি আটকে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির আশঙ্কায় না থাকেন।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নটি হলো, বিচার বিভাগ কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত? অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক আমলে বিচার বিভাগের নিয়োগ, পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি, জামিন, রায় এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কখনো বিচারকদের ওপর প্রত্যক্ষ চাপের অভিযোগ উঠেছে, কখনো উচ্চ আদালতের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট রায় সরকারের পক্ষে গেলেই বিচারক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত-এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যুক্তিসংগত নয়। একইভাবে কোনো রায় সরকারের বিপক্ষে গেলেই বিচার বিভাগ স্বাধীনতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, এমন দাবিও যথার্থ নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ, বিচারিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আদালতের প্রতি জনআস্থা এবং ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ।
বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের আরেকটি ক্ষেত্র হলো বিচারাধীন মামলা নিয়ে জনপরিসরে চাপ সৃষ্টি। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারকদের উদ্দেশ্যে হুমকি, ব্যক্তিগত আক্রমণ অথবা রায়ের আগেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার প্রবণতা বিচারিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। উল্লেখ্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা প্রায়ই সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়, বিচারক নিয়োগ কিংবা সাংবিধানিক বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের কাছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অর্থ আরও সরল-তিনি কি সময়মতো ন্যায়বিচার পাবেন?
বাংলাদেশের আদালতগুলোতে মামলাজট, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্তের দুর্বলতা, আইনজীবীর ব্যয়, আদালতের অবকাঠামোগত সংকট এবং বিচারপ্রার্থীর আর্থিক অসামর্থ্য এখনো বড় সমস্যা। একজন দরিদ্র মানুষ যদি বছরের পর বছর মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান, তাহলে তার কাছে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সুফল কতোটা পৌঁছালো?
স্বাধীন আদালত যদি সময়মতো মামলা নিষ্পত্তি করতে না পারে, বিচারপ্রার্থী যদি নিরাপত্তা না পান, জামিন ও বিচার প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ থাকে, কিংবা আদালতের আদেশ বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন নাগরিকের জীবনে পূর্ণ অর্থ বহন করবে না। এ কারণে বিচার বিভাগের সংস্কারের সঙ্গে মামলাজট নিরসন, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সাক্ষী সুরক্ষা, আইনি সহায়তা এবং আদালতের অবকাঠামো উন্নয়নকে যুক্ত করতে হবে। বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ যেন অর্থ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর না করে।
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং এর সাংবিধানিক ভিত্তি সুস্পষ্টকরণ। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান ও আইন পর্যালোচনা করে এমন ব্যবস্থা করা, যাতে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো অস্পষ্টতা না থাকে। দ্বিতীয়ত, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তি নিশ্চিতকরণ। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, যাচাই প্রক্রিয়া এবং যথাসম্ভব স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি প্রয়োজন। নিয়োগ যেন দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের পুরস্কারে পরিণত না হয়। তৃতীয়ত, বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণ। বাজেট বরাদ্দ, অবকাঠামো, জনবল এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় নির্বাহী বিভাগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে প্রশাসনিক স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। চতুর্থত, বিচারকদের জবাবদিহির জন্য স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিচারকের স্বাধীনতা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তিও নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, বিচার প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। মামলাজট কমানো, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, আইনি সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আদালতব্যবস্থা ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নাগরিকের অধিকার রক্ষায় পূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে না।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগ পৃথক্করণের ইতিহাস আমাদের শেখায়, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক চাপ-তিনটিই প্রয়োজন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাজনৈতিক বা দলীয় অনুগ্রহ নয়, গণতন্ত্রের জরুরি শর্ত ও নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হবে, কিন্তু আদালতের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের ভিত্তি যেন বদলে না যায়। কারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশাসনিক ভবন, পদমর্যাদা কিংবা অধ্যাদেশের ভাষায় নিহিত নয়। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের মধ্যে অবস্থিত।
লেখক: চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।