তীর্যক বিশ্লেষণ

মেড ইন বাংলাদেশ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

নিয়াজ মাহমুদ | মতামত
নভেম্বর ৭, ২০২৬
মেড ইন বাংলাদেশ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

যে শ্রমিকের ঘামে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি, সেই শ্রমিকের নিজের সংসারেই কেন এত বঞ্চনা? ইউরোপে প্রায় ১০ বছর ধরে বসবাস করছি। এই দীর্ঘ সময়ে একটি বিষয় আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার অসংখ্য মানুষ হয়তো বাংলাদেশকে খুব ভালোভাবে চেনেন না। বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি কিংবা অর্থনীতি সম্পর্কে তাদের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। অথচ তাদের পরনের পোশাকের লেবেলে জ্বলজ্বল করছে বাংলাদেশের নাম মেড ইন বাংলাদেশ। ইউরোপের নামিদামি শপিংমল থেকে শুরু করে সাধারণ পোশাকের দোকান, বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড থেকে দৈনন্দিন ব্যবহারের পোশাক-সর্বত্রই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের উপস্থিতি চোখে পড়ে। বিদেশের মাটিতে নিজের দেশের নাম দেখে গর্ব হয়, বুকটা ভরে ওঠে। মনে হয়, আমাদের দেশের শ্রমিকরা তাদের শ্রম দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছেন।
 

কিন্তু সেই গর্বের আড়ালেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। যাদের শ্রমে ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ পোশাক পরছেন, তাদের নিজেদের জীবনে কতোটুকু স্বস্তি আছে? যে হাত বিদেশের মানুষের শরীরে নতুন পোশাক তুলে দিচ্ছে, সেই হাতের মানুষটি কি নিজের সন্তানের মুখে পর্যাপ্ত খাবার তুলে দিতে পারছেন? যে শ্রমিকের ঘামে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ছে, সেই শ্রমিকের পরিবার কেন এখনো বাড়িভাড়া, চাল-ডাল, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে?
 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আজ বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত শক্তি। রপ্তানি বাড়ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে, উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সমপ্রসারিত হচ্ছে। রাষ্ট্রও এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ করছাড় ও নীতিগত সুবিধা দিচ্ছে। অথচ শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার শ্রমিকের জীবনমান সেই অনুপাতে উন্নত হচ্ছে না। একদিকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের জয়যাত্রা, অন্যদিকে শ্রমিকের সংসারে অভাব, ঋণ আর অনিশ্চয়তা। এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি আমাদের উন্নয়ন দর্শন ও সামাজিক দায়বদ্ধতারও বড় প্রশ্ন।
 

তাহলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাফল্যের ভাগ কি শুধু মালিক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের জন্য? এই শিল্পকে যারা নিজেদের শ্রম দিয়ে দাঁড় করিয়েছেন, সেই শ্রমিকেরা কি শুধু উৎপাদনের অংশীদার হবেন, সাফল্যের অংশীদার হবেন না? বিশ্ববাসীর গায়ে বাংলাদেশের পোশাক থাকলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? নাকি সেই পোশাকের কারিগরদের জীবনেও সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করার সময় এসেছে?
এই প্রশ্ন শুধু আবেগের নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতারও। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান, বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পরিচিতি, সবকিছুর সঙ্গে এই শিল্প জড়িয়ে আছে। 
 

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। চীনের পরই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৫ সালে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৮২ কোটি মার্কিন ডলারে।
এই অর্জন একদিনে আসেনি। তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা ধস, করোনাভাইরাস মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক শুল্কনীতি পরিবর্তন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট-বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পটি টিকে আছে। কারখানার নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে উদ্যোগ, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধার এই অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এত বড় শিল্পের কেন্দ্রে থাকা শ্রমিকের জীবনমান কি সেই অনুপাতে এগিয়েছে?
 

বর্তমানে পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এই কাঠামো কার্যকর হয়েছিল। এরপর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে, বাড়িভাড়া ও যাতায়াত খরচ বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি।
 

একজন শ্রমিক মাস শেষে বেতন হাতে পেয়ে প্রথমেই বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন। সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজন সামনে এলে তাকে ধারদেনা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে খাবারের খরচ কমিয়েও সংসার চালাতে হয়। এমন বাস্তবতায় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি অস্বাভাবিক নয়। বরং তাদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনায় এই দাবি দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
 

প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের মধ্যে রয়েছে চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। প্রদত্ত এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি প্রায় ১০২ ডলার। বিপরীতে ভারতে ১২৪, পাকিস্তানে ১৩৫, ভিয়েতনামে ১৬৩, ইন্দোনেশিয়ায় ১৭২, কম্বোডিয়ায় ২০৮ এবং চীনে ২৯৪ ডলার।
অবশ্য দেশভেদে মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতি, কর্মঘণ্টা, ভাতা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও আইন প্রয়োগের পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই শুধু ডলারের অঙ্ক দিয়ে তুলনা করলেই পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। কিন্তু প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি যে কম, সেটি স্পষ্ট।
 

মালিকপক্ষের যুক্তি, বাংলাদেশের কারখানাগুলো তুলনামূলক কম দামের পোশাক তৈরি করে। উৎপাদনশীলতা কম, দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও কম দামে পণ্য কিনতে চান। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করা কঠিন।
 

এই যুক্তিগুলো বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়-প্রতিযোগিতা ধরে রাখার একমাত্র উপায় কি শ্রমিকের মজুরি কম রাখা?
মালিকদের জন্য করছাড়, শ্রমিকের জন্য কী? বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধা পেয়ে আসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পোশাক ও বস্ত্র খাত করপোরেট করেই ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ছাড় পেয়েছে। সাধারণ পোশাক কারখানার করপোরেট করহার ১২ শতাংশ এবং পরিবেশবান্ধব কারখানার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ। এর পাশাপাশি রয়েছে বন্ড সুবিধা, নগদ সহায়তা এবং রপ্তানিসংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধা।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে এসব সুবিধা দেয়া হয়। এতে আপত্তি নেই। কিন্তু রাষ্ট্র যখন একটি শিল্পকে বিপুল পরিমাণ করছাড় ও নীতিগত সুবিধা দেয়, তখন সেই শিল্পের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে আসা উচিত।
 

ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা মালিকদের দায়িত্ব। করছাড়, প্রণোদনা ও অন্যান্য সুবিধার সুফল যদি শুধু ব্যবসার সমপ্রসারণে সীমাবদ্ধ থাকে, শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে দৃশ্যমান প্রভাব না পড়ে, তাহলে এসব সুবিধার সামাজিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
৩০ হাজার টাকার দাবি কতোটা বাস্তবসম্মত? শ্রমিকদের বর্তমান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে এই অঙ্কে পৌঁছানো বড় পরিবর্তন। তবে বিষয়টি শুধু মালিকদের ব্যয় বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে বিচার করলে চলবে না।
 

দেখতে হবে, একজন শ্রমিকের পরিবারের ন্যূনতম মাসিক ব্যয় কত। খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে কতো টাকা প্রয়োজন। বর্তমান মজুরিতে সেই প্রয়োজন কতোটা পূরণ হচ্ছে।
একই সঙ্গে কারখানার উৎপাদন ব্যয়, মুনাফা, উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দেয়া পণ্যমূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
ন্যূনতম মজুরি এমন হতে হবে, যাতে শ্রমিক সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন। আবার কারখানাগুলোর সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবায়নের একটি কার্যকর পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
শ্রমিকদের আন্দোলনের পর সরকার ১লা নভেম্বর ছয় সদস্যের নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ৪ঠা নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মালিকপক্ষের নেতারা জানিয়েছেন, এবার আগের তুলনায় দ্রুত মজুরি পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। ৯ই নভেম্বর পরবর্তী সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
 

এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু বোর্ড গঠন করলেই শ্রমিকের সমস্যার সমাধান হবে না। কতো টাকা মজুরি নির্ধারিত হচ্ছে, কখন থেকে কার্যকর হচ্ছে এবং সব কারখানায় তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা? সেটিই আসল বিষয়।
মজুরি বোর্ডকে অবশ্যই জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, শিল্পাঞ্চলভেদে বাড়িভাড়া এবং শ্রমিকের অন্যান্য প্রয়োজন বিবেচনা করতে হবে। শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনতে হবে। সিদ্ধান্তের পেছনে কী তথ্য ও যুক্তি কাজ করেছে, তা প্রকাশ করতে হবে। মজুরি বৃদ্ধির কথা বলে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ আর থাকা উচিত নয়।
 

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়ও এড়ানোর সুযোগ নেই। ইউরোপে বসবাসের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় বড় বড় ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য কেনেন। তাদের কাছে পণ্যের মান, দাম, সরবরাহের সময় এবং নির্ভরযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এই প্রতিযোগিতার মধ্যে উৎপাদনকারী দেশের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
 

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যদি কম দামে পণ্য কিনতে চায়, অথচ শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার মতো উৎপাদনমূল্য দিতে আগ্রহী না হয়, তাহলে দায় শুধু বাংলাদেশের কারখানার ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না।
তাদেরও ন্যায্যমূল্য দিতে হবে, অর্ডার স্থিতিশীল রাখতে হবে এবং সময়মতো বিল পরিশোধ করতে হবে। শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সহিংসতা কিংবা অন্যের সম্পদ ধ্বংস করাও গ্রহণযোগ্য নয়। এসব কর্মকাণ্ডে শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
 

শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শ্রমিক আহত বা নিহত হলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা যাবে না।
সরকারকে শ্রমিক, মালিক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে কার্যকর আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, উন্নত বন্দর, পরিবহন, সহজ অর্থায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
কারখানাগুলোতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়লে উৎপাদনের মান ও পরিমাণ বাড়বে। সেই অর্জনের ন্যায্য অংশ শ্রমিকদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধায় প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
 

বিদেশে বাংলাদেশের পরিচিতি, দেশে শ্রমিকের সম্মান: ইউরোপে প্রায় এক দশকের বসবাসে বাংলাদেশের পোশাকের লেবেল দেখে গর্ব অনুভব করেছি। বিদেশের মানুষ যখন বাংলাদেশে তৈরি পোশাক ব্যবহার করেন, তখন মনে হয়, আমাদের দেশের শ্রমিকদের শ্রম বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
 

কিন্তু সেই গর্বের সঙ্গে একটি দায়িত্ববোধও কাজ করে। যে শ্রমিকের হাত ধরে বাংলাদেশের নাম ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে পৌঁছেছে, তার নিজের জীবন যদি অভাব, ঋণ ও অনিশ্চয়তায় আটকে থাকে, তাহলে সেই সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন বলা যায় না।
 

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে বাঁচাতে হবে। রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। কিন্তু এসব করতে গিয়ে শ্রমিকের জীবনকে উপেক্ষা করা যাবে না।
মালিকদের মুনাফা, সরকারের রাজস্ব, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ব্যবসা এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
 

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের পোশাক বিদেশের বাজারে পৌঁছায় কারখানার শ্রমিকের হাত ধরে। তাদের শ্রম ছাড়া কোনো ব্র্যান্ডের সাফল্য সম্ভব নয়।
বিশ্বের গায়ে মেড ইন বাংলাদেশের পোশাক থাকলেই হবে না, সেই পোশাক তৈরির কারিগরদের জীবনেও স্বস্তি থাকতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশের পরিচিতি যেমন বাড়ছে, দেশে শ্রমিকের মর্যাদাও তেমন বাড়াতে হবে। কারণ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এগোবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com

 

মতামত'র অন্যান্য খবর